SEBA Class 9 History Important Chapter 6 উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান ১৫৮ Question Answer Bengali Medium As Per New Syllabus to each chapter is provided in the list so that you can easily browse through different chapters SEBA Class 9 History Important Chapter 6 উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান ১৫৮ Solutions and select need one. Class 9 History Additional Notes in Bengali Medium Download PDF. SEBA Class 9 History Additional Question Answer.
Class 9 History Important Chapter 6 উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান ১৫৮
Also, you can read the NCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per Central Board of Secondary Education (CBSE) Book guidelines. SEBA Class 9 History Important Notes in Bengali are part of All Subject Solutions. Here we have given Class 9 History Additional Solutions in Bengali for All Chapters, You can practice these here.
উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান ১৫৮
Chapter: 6
| অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর |
১। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ আসামের ইতিহাসে কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা?
উত্তরঃ এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই সুদীর্ঘ ৬০০ বছরের আহোম রাজত্বের পতন শুরু হয়েছিল এবং দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলা এই বিদ্রোহের ফলে আহোম শাসনের কেন্দ্রীয় শক্তি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
২। মায়ামরা সত্রের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন এবং এটি বৈষ্ণবধর্মের কোন্ সংহতির অন্তর্গত ছিল?
উত্তরঃ মায়ামরা সত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অনিরুদ্ধদেব এবং এই সত্রটি বৈষ্ণবধর্মের বিখ্যাত ‘কালসংহতি’-র অন্তর্গত ছিল।
৩। মায়ামরা সত্রের শিষ্যরা প্রধানত কোন্ কোন্ জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিল?
উত্তরঃ মায়ামরা সত্রের শিষ্যরা প্রধানত মরাণ ও মটক উপজাতি বা জনগোষ্ঠীর লোক ছিল, যার পাশাপাশি চুতিয়া, কাছাড়ি, আহোম, কৈবর্ত এবং কোমর সম্প্রদায়ের মানুষও এতে যুক্ত ছিল।
৪। আহোম রাজশাসন ব্যবস্থার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কোন্ প্রথার ওপর নির্ভর করত?
উত্তরঃ আহোম রাজশাসন ব্যবস্থার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ‘পাইক’ প্রথার ওপর নির্ভর করত, যেখানে প্রজাদের বাধ্যতামূলকভাবে করের বদলে শারীরিক শ্রম দিতে হতো।
৫। একটি ‘গোট’ পাইক কীভাবে গঠিত হতো এবং রাজেশ্বর সিংহের আমলে এতে কয়জন পাইক ছিল?
উত্তরঃ প্রথম দিকে চারজন পাইক নিয়ে একটি ‘গোট’ গঠিত হতো, কিন্তু পরবর্তীতে স্বর্গদেব রাজেশ্বর সিংহের রাজত্বকালে এটি কমিয়ে তিনজন পাইক নিয়ে একটি ‘গোট’ গঠন করা হয়।
৬। স্বর্গদেব শিবসিংহের কোন্ রানীর আমলে মোয়ামরিয়া সত্রাধিকারদের ওপর প্রথম অপমানজনক আক্রমণ হয়েছিল?
উত্তরঃ স্বর্গদেব শিবসিংহের প্রধান মহিষী ‘বররাজা’ ফুলেশ্বরী কুঁয়রীর আমলে, যিনি জোর করে মোয়ামরিয়া সত্রাধিকারদের ডেকে দুর্গাপূজার প্রসাদ খাইয়েছিলেন এবং কপালে বলির পশুর রক্ত দিয়ে তিলক পরিয়েছিলেন।
৭। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক বা প্রত্যক্ষ কারণটি কী ছিল?
উত্তরঃ মরাণদের দুই নেতা নাহরখোয়া শইকীয়া ও রাঘব নেওগ রাজবাড়িতে বার্ষিক কর হিসেবে হাতি উপহার দিতে গেলে কীর্তিচন্দ্র বরবড়ুয়া হাতির খুঁত বের করে রাঘবকে প্রহার করেন এবং নাহরখোয়ার কান কেটে চরম অপমান করেন।
৮। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের ফলে সৃষ্ট তীব্র সংকট দমনে কোন ব্রিটিশ সৈন্যদল বা কর্মকর্তা অসমে এসেছিলেন?
উত্তরঃ মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের তীব্র প্রতিরোধ দমন করতে এবং আহোম রাজাকে সাহায্য করতে ক্যাপ্টেন ওয়েলস তাঁর ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী নিয়ে অসমে সামরিক অভিযান চালিয়েছিলেন।
৯। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের ফলে কোন্ নতুন স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর প্রথম করদ রাজা কে ছিলেন?
উত্তরঃ মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের ফলে ‘মটক রাজ্য’- এর সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর প্রথম করদ রাজা ও ‘বর সেনাপতি’ ছিলেন সর্বানন্দ সিংহ।
১০। খাসি প্রতিরোধ সংগ্রামের মহান নায়ক কে ছিলেন এবং তিনি কোন্ অঞ্চলের ‘সিয়েম’ বা প্রধান ছিলেন?
উত্তরঃ খাসি প্রতিরোধ সংগ্রামের মহান নায়ক ছিলেন স্বাধীনচেতা খাসি বীর ‘ইউ তিরত সিংএবং তিনি খাসি পাহাড়ের অন্তর্গত ‘নংক্ল’ রাজ্যের সিয়েম বা প্রধান ছিলেন।
১১। কোন্ ব্রিটিশ কর্মকর্তা প্রথমবার গুয়াহাটি থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত সংযোগকারী সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন?
উত্তরঃ ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট ডেভিড স্কট খাসি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে গুয়াহাটি থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
১২। তিরত সিং-এর নেতৃত্বে খাসি বিদ্রোহীরা কবে নংক্লের ব্রিটিশ স্বাস্থ্য-নিবাস ও সৈন্যদের ওপর প্রথম আক্রমণ চালিয়েছিল?
উত্তরঃ ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ই এপ্রিল তিরত সিং-এর নেতৃত্বে প্রায় চারশো খাসি কৃষক নংক্লের ব্রিটিশ স্বাস্থ্য-নিবাসে অতর্কিতে আক্রমণ করে জেনিংস শরিফসহ বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্যকে হত্যা করেছিল।
১৩। খাসি বীর তিরত সিং-এর মৃত্যু কবে এবং কোথায় হয়েছিল?
উত্তরঃ ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণের পর বন্দী অবস্থায় ঢাকা কারাগারে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে বীর তিরত সিং-এর মৃত্যু হয়।
১৪। মণিপুরি গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান নায়ক কে ছিলেন এবং তাঁর পিতা কে ছিলেন?
উত্তরঃ মণিপুরি গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান নায়ক ছিলেন সেনাপতি বীর টিকেন্দ্রজিৎ সিংহ এবং তাঁর পিতা ছিলেন মণিপুরের মহারাজা চন্দ্রকীর্তি সিংহ।
১৫। টিকেন্দ্রজিৎ সিংহ এবং জেনারেল থঙ্গালকে ব্রিটিশরা কবে এবং কোথায় ফাঁসি দিয়েছিল?
উত্তরঃ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই আগস্ট ইম্ফলের পোলো ফিল্ডে হাজার হাজার মণিপুরি নর-নারীর সামনে টিকেন্দ্রজিৎ সিংহ এবং জেনারেল থঙ্গালকে সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
দীঘলীয়া প্রশ্ন উত্তর।
১। অসমে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের প্রধান ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো।
উত্তরঃ অসমে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের প্রধান ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণসমূহ:
ধর্মীয় কারণ:
(i) আহোম শাসকদের শাক্ত ধর্ম গ্রহণ: আহোম শাসকেরা খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে অসমে বসবাস শুরু করলেও শুরুতে তাঁদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস, শাস্ত্র ও পুরোহিত শ্রেণী ছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আহোম রাজারা বঙ্গদেশ থেকে শাক্ত ধর্মীয় গুরুদের এনে তাঁদের কাছ থেকে দীক্ষা নেন।
(ii) মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণবধর্মের প্রতি রাজকীয় বিরোধ: মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণবধর্ম ছিল মূলত শ্রেণীহীন ও সাম্যবাদী ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সামন্তবাদী আহোম শাসকেরা প্রথম থেকেই এই সাম্যবাদী আদর্শকে নিজেদের রাজক্ষমতার প্রতি হুমকি বলে মনে করতেন এবং এর বিরোধিতা করতেন।
(iii) সত্রগুলির প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ: আহোম রাজারা পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাদের দ্বারা প্রভাবিত এবং সাম্যবাদী ঐতিহ্য থেকে কিছুটা সরে আসা বৈষ্ণব সত্রগুলিকে (যেমন—আউনিআটি, দক্ষিণপাট, গড়মুর, কুরুয়াবাহি) পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন।
সামাজিক কারণ:
(i) নিম্নবর্ণ ও উপজাতিদের সঙ্ঘবদ্ধতা: মায়ামরা সত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহাপুরুষ শংকরদেবের নিম্নবর্ণের শিষ্য অনিরুদ্ধদেব। তিনি হিন্দু সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ এবং অসমের বিভিন্ন উপজাতীয় মানুষদের বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষায় বিশেষভাবে আকর্ষিত করেছিলেন।
(ii) সামাজিক অত্যাচার ও বঞ্চনা: আহোম সামন্ততান্ত্রিক সমাজে এই নিম্নবর্গের উপজাতীয় মানুষরা প্রতিনিয়ত সামাজিক অত্যাচারের শিকার হতেন। উচ্চবর্ণের শাক্ত শাসক শ্রেণী ও রাজকর্মচারীরা তাঁদের অস্পৃশ্য ও হেয় চোখে দেখত।
অর্থনৈতিক কারণ:
(i) শোষণমূলক পাইক প্রথা: আহোম রাজশাসন ব্যবস্থার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল ‘পাইক’ প্রথা। রাজপরিবার, উচ্চবর্গের রাজকর্মচারী ও পুরোহিত ছাড়া ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রতিটি সুস্থ পুরুষ প্রজাকে রাষ্ট্রের জন্য গায়ে-গতরে খেটে বা সৈন্য হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রম দিতে হতো, যাঁদের ‘পাইক’ বলা হতো।
(ii) যুদ্ধের জন্য বলির পাঁঠা বানানো: যেকোনো যুদ্ধের সময় বা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার জন্য এই সাধারণ পাইকদেরই সবার আগে এগিয়ে দেওয়া হতো, যার ফলে তাঁদের মনে ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে।
(iii) বিদ্রোহের সাহস সঞ্চয়: মরাণ ও মটকেরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের কঠোর পরিশ্রম ও সরবরাহ করা সামগ্রী ছাড়া আহোম শাসনতন্ত্র সম্পূর্ণ অচল ও দুর্বল হয়ে পড়বে। রাজতন্ত্রের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা উপলব্ধি করেই তারা প্রচলিত নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ করার সাহস পেয়েছিল।
২। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল এবং আহোম রাজত্বের পতনে এর ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তরঃ মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল এবং আহোম শাসনের পতনে এর ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
সুদূরপ্রসারী সামাজিক ফলাফল:
(i) তীব্র সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ: এই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান মূল চরিত্র ছিল হিন্দুধর্মের গোঁড়া ব্রাহ্মণবাদ এবং নিম্নবর্গের মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণব পন্থার মধ্যকার গভীর আদর্শগত সংঘাত।
(ii) সত্রসমূহের ধ্বংসসাধন ও পারস্পরিক হিংসা: বিদ্রোহের চরম মুহূর্তে মায়ামরা বা মোয়ামরিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা সুযোগ পেলেই অন্যান্য ‘সংহতি’র বৈষ্ণব সত্রগুলিকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দিত। অন্যদিকে, বিপরীত পরিস্থিতিতে রাজকীয় শক্তির সমর্থনে মোয়ামরিয়া সমর্থিত সত্রগুলির ওপরেও অমানুষিক অত্যাচার ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতো।
(iii) অমানবিক অত্যাচার ও জনসংখ্যার অবক্ষয়: বিদ্রোহ চলাকালীন যুদ্ধরত উভয় পক্ষই চরম অমানবিকতা ও হিংস্রতার পরিচয় দিয়েছিল। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহী এবং রাজপুরুষ ও তাদের সমর্থকেরা দোষী-নির্দোষী বিচার না করে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুসহ বহু সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা, অকথ্য নির্যাতন ও নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত করেছিল।
সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ফলাফল:
(i) কৃষিকাজের চরম বিপর্যয়: যুদ্ধের ধাক্কায় অসমের প্রধান অর্থনৈতিক উৎস কৃষিকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন ওয়েলসের সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে, মোয়ামরিয়াদের তীব্র উৎপীড়ন ও আক্রমণের ভয়ে কৃষকেরা তাঁদের চাষভূমির পাকা ধান কাটার সুযোগ না পেয়ে তা মাঠেই ফেলে রেখে প্রাণভয়ে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে বা পার্শ্ববর্তী রাজ্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
(ii) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ: কৃষিকাজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সমগ্র অসমে এক ভয়াবহ কালান্তক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। খাদ্যশস্যের তীব্র সংকটে বহু মানুষ অনাহারে পথেই প্রাণ হারায়।
(iii) চরম খাদ্যাভাব ও হাহাকার: পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় রূপ ধারণ করেছিল যে, মোয়ামরিয়াদের দমন করার জন্য রাজদরবার থেকে যে সৈন্যদল নিয়োগ করা হয়েছিল, তারা তীব্র খাদ্যাভাবে নিজেদের জীবন বাঁচাতে রাজকীয় হাতি ও ঘোড়াগুলি হত্যা করে তাদের মাংস খেতে বাধ্য হয়েছিল।
আহোম রাজত্বের পতনে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের ভূমিকা:
(i) শাসনতন্ত্রের বাঁধুনি শিথিল ও রাজকীয় দুর্বলতা: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ধাক্কায় আহোমদের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার মজবুত বাঁধুনি একেবারে আলগা ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আহোম রাজারা নিজেদের সামরিক শক্তির অপ্রতুলতা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ঢাকার জন্য বিদেশী শক্তির সাহায্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
(ii) রাজকীয় মর্যাদা ও প্রজাদের অনাস্থা: মোয়ামরিয়াদের ক্রমাগত আক্রমণের মুখে জীবন বাঁচাতে আহোম স্বর্গদেব গৌরীনাথ সিংহ বারবার রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান (প্রথমে গুয়াহাটি এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেও পালিয়ে নগাঁওয়ে আশ্রয় নেন)।
৩। খাসি প্রতিরোধ সংগ্রামে ‘ইউ তিরত সিং’- এর ভূমিকা এবং এই সংগ্রামের ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তরঃ খাসি প্রতিরোধ সংগ্রামে ইউ তিরত সিংহের ভূমিকা:
(i) ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিরত সিং খাসি পাহাড়ের অন্যান্য স্বাধীন রাজ্যগুলির সিয়েমদের একত্রিত করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মিলিমের সিয়েম বর মানিক, মুকুন্দ সিং, মনকর সিং, যুদা সিং প্রমুখ সিয়েমরা একযোগে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সমসাময়িক অন্যান্য ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের তুলনায় খাসি বিদ্রোহ অনেক বেশি পরিপক্ব ও সুসংগঠিত ছিল।
(ii) নংক্ল আক্রমণ ও যুদ্ধ শুরু: ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ই এপ্রিল তিরত সিংহের নেতৃত্বে প্রায় চারশো সশস্ত্র খাসি যুবক নংক্লের ব্রিটিশ স্বাস্থ্য-নিবাস ও দপ্তরে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। তাঁরা সেখানে থাকা ব্রিটিশ অফিসার লেফটেনেন্ট বেডিংফিল্ড এবং লেফটেনেন্ট বার্লটন- কে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেন।
(iii) গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল: খাসিদের এই অতর্কিত আক্রমণে কোম্পানি প্রশাসন স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। খাসি বিদ্রোহীরা শ্রীহট্ট ও গুয়াহাটির সাথে সংযোগকারী পথগুলি অবরুদ্ধ করে দেয়। ব্রিটিশদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বিপরীতে খাসিদের কাছে কেবল ঐতিহ্যবাহী ধনুক, তীর, তলোয়ার ও ঢাল ছিল।
খাসি প্রতিরোধ সংগ্রামের ফলাফল:
(i) খাসি পাহাড়ের স্বাধীনতা হরণ: তিরত সিংহের আত্মসমর্পণের পর সমগ্র খাসি ও জয়ন্তীয়া পাহাড়ি অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে যায় এবং সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রভুত্ব স্থাপিত হয়।
(ii) তিরত সিংহের আজীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যু: ব্রিটিশরা তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বীর তিরত সিং-কে রেহাই দেয়নি। তাঁকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে মাসিক ৬৩ টাকা পেনশন দিয়ে ঢাকা কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। বন্দী অবস্থায় অত্যন্ত করুণভাবে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ঢাকা কারাগারেই এই মহান খাসি বীরের মৃত্যু হয়।
(iii) জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ: খাসি বিদ্রোহ সামরিকভাবে ব্যর্থ হলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি জনজাতির মধ্যে এটি গভীর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দিয়েছিল।
৪। মণিপুরি গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি, টিকেন্দ্রজিৎ সিংহের ভূমিকা এবং ব্রিটিশদের দমননীতির বিবরণ দাও।
উত্তরঃ মণিপুরি গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি, টিকেন্দ্রজিতের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং ব্রিটিশদের নৃশংস দমননীতির বিবরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি:
(i) মণিপুরের রাজপরিবারের গৃহকোন্দল: ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের মহারাজা চন্দ্রকীর্তি সিংহের মৃত্যুর পর রাজপরিবারে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ভাইদের মধ্যে তীব্র গৃহকোন্দল শুরু হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র সুরচন্দ্র সিংহ সিংহাসনে আরোহণ করলেও কনিষ্ঠ ভাই কুলচন্দ্র এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় যুবরাজ সেনাধ্যক্ষ টিকেন্দ্রজিৎ সিংহের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন।
(ii) ব্রিটিশদের কুচক্র ও হস্তক্ষেপ: সুরচন্দ্র সিংহ কলকাতায় গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে সিংহাসন পুনরুদ্ধারের আবেদন জানালে ব্রিটিশরা মণিপুরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর মোক্ষম সুযোগ পায়। আসামের মুখ্য কমিশনার জেমস জেমস ওয়ালেস কুইন্টন এবং পলিটিক্যাল এজেন্ট গ্রিমউডের মধ্যে আলোচনায় ঠিক হয় যে, সুরচন্দ্রকে আর মণিপুরে ফিরিয়ে আনা হবে না।
বীর টিকেন্দ্রজিৎ সিংহের ভূমিকা:
(i) টিকেন্দ্রজিৎ সিংহ: ছিলেন অসাধারণ রণকুশলী এবং মণিপুরের জনগণের অত্যন্ত প্রিয় নেতা। বাঘ শিকারের পারদর্শিতার জন্য তাঁর পিতা চন্দ্রকীর্তি সিংহ তাঁকে আদর করে ‘কইরেং’ (বাঘ শিকারি) বলে ডাকতেন। তিনি মণিপুরি ভাষা ছাড়াও বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
(ii) ব্রিটিশদের চক্রান্ত এড়ানো ও দরবার বর্জন: ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মার্চ আসামের মুখ্য কমিশনার জে. ডব্লিউ. কুইন্টন এক বিশাল ফৌজ নিয়ে ইম্ফলে পৌঁছান। ২২শে মার্চ তিনি রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘দরবার’ ডাকেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দরবারেই টিকেন্দ্রজিৎকে কৌশলে বন্দী করা।
(iii) ব্রিটিশদের আক্রমণ প্রতিহতকরণ: বন্দী করার ফন্দি ব্যর্থ হওয়ায় ২৪শে মার্চ ভোরে ব্রিটিশ সৈন্যরা অতর্কিতে টিকেন্দ্রজিতের বাসভবন আক্রমণ করে এবং ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়।
ব্রিটিশদের পাশবিক দমননীতি:
(i) বিশাল সামরিক অভিযান: ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ব্রিটিশ জেনারেল কোলেটের নেতৃত্বে প্রায় ৮,০০০ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক বিশাল সেনাবাহিনী মণিপুরে প্রবেশ করে। খংজোমের যুদ্ধে পাবনা ব্রজবাসীর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ছাড়া মণিপুরি বাহিনী আধুনিক ব্রিটিশ কামানের সামনে বেশিদিন টিকতে পারেনি এবং ১৮৯১ সালের ২৭শে এপ্রিল ব্রিটিশরা ইম্ফল দখল করে নেয়।
(ii) পুরস্কার ঘোষণা ও চরম হয়রানি: ইম্ফল সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ জঙ্গল ও পাহাড়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। ব্রিটিশ সেনাধ্যক্ষ কোলেট ঘোষণা করেন যে, বিদ্রোহী নেতাদের আশ্রয় দিলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়— মহারাজা কুলচন্দ্রের মাথার মূল্য ৫,০০০ টাকা, টিকেন্দ্রজিতের ৫,০০০ টাকা, জেনারেল থঙ্গালের ২,০০০ টাকা এবং সুবেদার নিরঞ্জন সিংহের জন্য ১,০০টি টাকা।
৫। অসমে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের অব্যবহিত বা প্রত্যক্ষ কারণ এবং কীভাবে ‘মটক রাজ্যের’ সৃষ্টি হয়েছিল তা বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তরঃ অসমে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ কোনো সাধারণ বিক্ষোভ ছিল না, এটি ছিল আহোম স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া এক সুসংগঠিত গণবিদ্রোহ।
এর প্রত্যক্ষ কারণ এবং পরবর্তীতে ‘মটক রাজ্যের’ সৃষ্টির ইতিহাস আলোচনা করা হলো:
(ক) বিদ্রোহের অব্যবহিত বা প্রত্যক্ষ কারণ: ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে ঘটা একটি চরম অপমানজনক ঘটনাই ছিল এই সুদীর্ঘ বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ। মায়ামরা সত্রের অন্যতম প্রধান উপজাতীয় শিষ্য এবং মরাণদের দুই প্রগতিশীল নেতা নাহরখোয়া শইকীয়া ও রাঘব নেওগ আহোম রাজবাড়িতে বার্ষিক কর ও যৌতুক হিসেবে এক পাল হাতি উপহার দিতে গিয়েছিলেন।
সেই সময় আহোম রাজদরবারের প্রভাবশালী এবং অত্যন্ত অহংকারী বরবড়ুয়া কীর্তিচন্দ্র বরবড়ুয়া হাতির নানা খুঁত বের করে রাঘব নেওগকে অকথ্য গালিগালাজ করেন এবং নির্মমভাবে মারধর করেন। শুধু তাই নয়, তিনি নেতা নাহরখোয়া শইকীয়ার কান কেটে দিয়ে চরম লাঞ্ছনা করেন।
(খ) ‘মটক রাজ্য’- এর সৃষ্টি: দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের ফলে আহোম রাজতন্ত্র চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘মরাণ’ ও ‘মটক’ জনগোষ্ঠী, যারা মায়ামরা সত্রের একনিষ্ঠ শিষ্য ছিল।
বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে আহোম প্রধানমন্ত্রী পূর্ণানন্দ বুঢ়াগোহাঁই উপলব্ধি করেন যে শক্তি প্রয়োগ করে এই মোয়ামরিয়া বা মরাণদের পুরোপুরি দমন করা অসম্ভব এবং এতে আহোম সাম্রাজ্যের ধ্বংস অনিবার্য।
তাই তিনি কূটনীতির আশ্রয় নেন এবং মরাণ উপজাতি ও মটক সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট করতে তাদের অন্যতম প্রধান নেতা সর্বানন্দ সিংহ-এর সাথে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদ এবং বুঢ়ীদিহিং নদীর মধ্যবর্তী সমতল অঞ্চল অর্থাৎ বেংমারা-কে কেন্দ্র করে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘মটক রাজ্য’ গঠন করা হয়।

