Class 9 History Chapter 2 ফরাসি বিপ্লব

Class 9 History Chapter 2 ফরাসি বিপ্লব Question Answer Bengali Medium As Per New Syllabus to each chapter is provided in the list so that you can easily browse through different chapters SEBA Class 9 History Chapter 2 ফরাসি বিপ্লব Solutions and select need one. Class 9 History Textbook Notes in Bengali Medium Download PDF. SEBA Class 9 History Textual Question Answer.

Class 9 History Chapter 2 ফরাসি বিপ্লব

Also, you can read the NCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per Central Board of Secondary Education (CBSE) Book guidelines. SEBA Class 9 History Solutions in Bengali are part of All Subject Solutions. Here we have given Class 9 History Textual Solutions in Bengali for All Chapters, You can practice these here.

Chapter: 2

প্রশ্নাবলী

১। অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

(ক) ফরাসি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের সম্রাট কে ছিলেন?

উত্তরঃ ফরাসি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন বুঁরবঁ রাজবংশের ষোড়শ লুই।

(খ) ক্যাইয়ার কে?

উত্তরঃ ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৮৯ সালে স্টেটস্ জেনারেলের অধিবেশন ডাকলে, রাজ-আদেশ অনুযায়ী প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকা থেকে জনগণের যেসব অভাব-অভিযোগ ও দাবির লিখিত বিবরণ বা প্রতিবেদন নিয়ে এসেছিলেন, সেগুলিকে ‘ক্যাইয়ার’ বলা হয়।

(গ) ‘দ্য ওয়েল্থ অব ন্যাশনস’-এর লেখক কে?

উত্তরঃ বিখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ হলেন ‘দ্য ওয়েল্থ অব ন্যাশনস’ গ্রন্থের লেখক।

(ঘ) সম্রাট ষোড়শ লুইকে কবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি রাজা ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

(ঙ) ভিয়েনা কংগ্রেস কত খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?

উত্তরঃ ভিয়েনা কংগ্রেস ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

(চ) কে বলেছিলেন, ‘আমিই রাষ্ট্র’?

উত্তরঃ ফ্রান্সের বুঁরবঁ রাজবংশের পরাক্রমী সম্রাট চতুর্দশ লুই অহংকার করে বলেছিলেন, ‘আমিই রাষ্ট্র’।

(ছ) কে নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ রূপে অভিহিত করেছিলেন?

উত্তরঃ ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ রূপে অভিহিত করেছিলেন।

(জ) কে বলেছেন, ‘ফ্রান্স হাঁচি দিলে ইউরোপের সর্দি লাগে’?

উত্তরঃ অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর বা মন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিক ফ্রান্সের বিপ্লব ও তার প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এই কথাটি বলেছিলেন।

(ঝ) ‘টেনিস কোর্টের শপথ’ কার সভাপতিত্বে গ্রহণ করা হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন বিজ্ঞানী ও বিপ্লবী বেইলি – র সভাপতিত্বে ‘টেনিস কোর্টের শপথ’ গ্রহণ করা হয়েছিল।

(ঞ) ‘সোশ্যাল কনট্রাক্ট’ কার সভাপতিত্বে গ্রহণ করা হয়েছিল?

উত্তরঃ ‘সোশ্যাল কনট্রাক্ট’ কোনো সভা বা শপথ ছিল না, এটি একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই বিখ্যাত গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন ফরাসি দার্শনিক জঁ জাক রুশো।

(ট) কবে প্রথম ফ্রান্সে গণরাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে প্রথম গণরাজ্য (প্রজাতন্ত্র) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

(ঠ) ১৮ ব্রুমেয়ার্ট-এ কী ঘটেছিল?

উত্তরঃ ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯-১০ নভেম্বর (যা ফরাসি বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ব্রুমেয়ার) এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ডিরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা কেড়ে নেন এবং ‘কনসুলেট’ নামক এক নতুন শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

(ড) ফরাসি বিপ্লবের বাণী কী ছিল?

উত্তরঃ ফরাসি বিপ্লবের মূল বাণী ছিল— “সাম্য, মৈত্রী এবং স্বাধীনতা”।

২। সংক্ষিপ্ত টাকা লেখো।

(ক) স্টেটস জেনারেল।

উত্তরঃ স্টেটস জেনারেল ছিল প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের যাজক অভিজাত এবং সাধারণ মানুষ (তৃতীয় সম্প্রদায়) এই তিন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি প্রাচীন ফরাসি জাতীয় সভা বা আইন পরিষদ। ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দের পর দীর্ঘ ১৭৫ বছর ফরাসি রাজারা এই সভার কোনো অধিবেশন ডাকেননি। কিন্তু ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের চরম আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট মোকাবিলা করতে সম্রাট ষোড়শ লুই অর্থমন্ত্রীদের পরামর্শে পুনরায় স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান করতে বাধ্য হন।

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে প্যারিসের কাছে ভার্সাই নগরীতে এই অধিবেশন শুরু হয়। এই সভায় মাথাপিছু ভোটদানের অধিকার নিয়ে রাজতন্ত্রের সাথে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের তীব্র বিরোধ বাধে, যা ফরাসি বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।

(খ) বাস্তিলের পতন।

উত্তরঃ বাস্তিলের পতনের কারণ: ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে রাজা ষোড়শ লুই জাতীয় সভাকে দমন করার জন্য প্যারিস ও ভার্সাইয়ের চারপাশে সেনা মোতায়েন করেন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত করেন। এতে প্যারিসের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে।

ফলাফল: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই উত্তেজিত ফরাসি জনতা বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এবং বন্দীদের মুক্ত করে দেয়। এই ঘটনাটি ফরাসি বিপ্লবকে এক নতুন গতি দেয় এবং রাজকীয় অত্যাচারের অবসান ঘটায়। বর্তমানে এই ১৪ জুলাই দিনটিকে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

(গ) মানব ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা।

উত্তরঃ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি জাতীয় সভা কর্তৃক প্রবর্তিত জনগণের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটি ‘মানব ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা’ নামে পরিচিত। আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ফরাসি দার্শনিক রুশোর চিন্তাধারার অনুপ্রেরণায় এই ঘোষণাপত্রটি রচিত হয়। এতে বলা হয় যে মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং আইনের চোখে সকলেই সমান। 

এছাড়া এতে বাক্ স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিয়মতান্ত্রিক বিচার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অলঙ্ঘনীয় অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই ঘোষণাটি ফ্রান্সের পুরাতন সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ভেঙে দেয় এবং পরবর্তীকালের সমগ্র ইউরোপীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

(ঘ) প্যারিস কমিউন।

উত্তরঃ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে বাস্তিল দুর্গের পতনের পর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস হয়ে ওঠে বিপ্লবের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই সময়ে প্যারিস শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার উদ্দেশ্যে যে স্বায়ত্তশাসিত বিপ্লবী নগর পরিষদ গড়ে ওঠে, তাকে ‘প্যারিস কমিউন’ বলা হয়। এটি ছিল উগ্রপন্থী বিপ্লবী দলগুলির শক্ত ঘাঁটি। 

১৭৯১ ও ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী নেতা ডেন্টন সহ অন্যান্য রাজতন্ত্রবিরোধী নেতারা এই প্যারিস কমিউনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। ফরাসি বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এবং ১৭৯২ সালে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে এই স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেছিল।

(ঙ) সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ড।

উত্তরঃ ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং রাজা ষোড়শ লুইকে বন্দী করা হয়। এই সময় ফ্রান্সের বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার মতো বিদেশি রাজতান্ত্রিক শক্তিগুলি যুদ্ধ ঘোষণা করে প্যারিসের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করলে ফরাসি জনগণের মনে তীব্র আতঙ্ক ও সন্দেহ তৈরি হয়। এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে টানা পাঁচ দিন ধরে প্যারিসের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী থাকা রাজতন্ত্রের সমর্থক, যাজক ও সন্দেহভাজন রাজদ্রোহীদের ওপর উন্মত্ত জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে। নামমাত্র বিচারের নামে প্রায় এক থেকে দুই হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসে ‘সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ড’ নামে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

(চ) মহিলাদের শোভাযাত্রা।

উত্তরঃ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে যখন প্যারিসে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষ এক টুকরো রুটির জন্য হাহাকার করতে থাকে, ঠিক তখন রাজা ষোড়শ লুই ভার্সাই প্রাসাদে রাজকীয় ভোজসভার আয়োজন করেন। রাজার এই সংবেদনহীন কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে প্যারিসের সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর প্যারিসের প্রায় ৮,০০০ ক্ষুধার্ত মহিলা লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে খাদ্যের (রুটির) সন্ধানে রাজবাড়ি ভার্সাই প্রাসাদের উদ্দেশ্যে এক বিশাল মিছিল বের করেন, যা ইতিহাসে ‘মহিলাদের শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত। 

(ছ) সন্ত্রাসের রাজত্ব।

উত্তরঃ ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রাজা ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর ফ্রান্সের নবজাত প্রজাতন্ত্র চারিদিক থেকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বৈদেশিক আক্রমণের মুখে পড়ে। এই চরম সংকট থেকে বিপ্লব ও দেশকে রক্ষা করতে ফ্রান্সে ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত (প্রায় এক বছরেরও বেশি সময়) যে কঠোর ও রক্তক্ষয়ী শাসন চলেছিল, তাকেই ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ বলা হয়। উগ্রপন্থী জেকোবিন দলের নেতা ম্যাক্সিমিলিয়ান রবসপিয়ের মারাত ও ডেন্টন এই শাসনের নেতৃত্ব দেন।

(জ) জেকোবিন ক্লাব বা দল।

উত্তরঃ ফরাসি বিপ্লবকালীন জাতীয় আইনসভার রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী, উগ্র ভাবাদর্শের এবং চরমপন্থী ক্লাব বা দল ছিল জেকোবিন দল। জেকোবিনদের মূল আদর্শ ছিল— ‘জনতাই হল সকল ক্ষমতার অধিকারী এবং জনগণের ইচ্ছানুসারেই রাষ্ট্রের সমস্ত কাজ পরিচালনা করা উচিত’। এই জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক ভাবধারার কারণে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত এদের অসংখ্য শাখা গড়ে ওঠে। এই দলের প্রধান নেতাদের মধ্যে ছিলেন রবসপিয়ের, মারাত ও ডেন্টন। ১৭৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের চরম সংকটের সময় এই দলটি শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং দেশ ও বিপ্লবকে রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর ও রক্তক্ষয়ী ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ পরিচালনা করে।

(ঝ) কনস্যুলেট।

উত্তরঃ ১৭৯৫-৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা ফ্রান্সের ‘ডিরেক্টরি শাসন’ চরম দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এই অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯-১০ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ডিরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটান। ডিরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে যে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তা ‘কনস্যুলেট’ নামে পরিচিত। এই শাসনব্যবস্থায় দেশের সর্বময় ক্ষমতা তিনজন ‘কনসাল’-এর হাতে ন্যস্ত করা হয়, যার মধ্যে নেপোলিয়ন নিজে ছিলেন ‘প্রথম কনসাল’ এবং কার্যত সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। এই কনস্যুলেট শাসনের মাধ্যমেই ফ্রান্সে নেপোলিয়নের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীকালে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন।

৩। বড়ো প্রশ্ন।

(ক) ফরাসি বিপ্লবের কারণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো।

উত্তরঃ বিপ্লবের প্রধান কারণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

(i) সামাজিক কারণ:

তিনটি সম্প্রদায়: তৎকালীন ফরাসি সমাজ মূলত তিনটি স্তরে বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল— প্রথম সম্প্রদায় দ্বিতীয় সম্প্রদায় এবং তৃতীয় সম্প্রদায় (সাধারণ মানুষ, যার মধ্যে ছিলেন কৃষক, বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষ)। 

সুবিধাভোগী বনাম সুবিধাহীন শ্রেণী: যাজক ও অভিজাতরা ছিলেন সমাজের সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য (আড়াই কোটি ফরাসি অধবাসীর মধ্যে যাজক ছিলেন মাত্র ১,৩০,০০০ এবং অভিজাতরা ছিলেন ১,৫০,০০০)। কিন্তু তাঁরাই ছিলেন দেশের পরম সুবিধাভোগী শ্রেণী এবং দেশের অধিকাংশ ভূসম্পত্তি তাঁদেরই হাতে ছিল।

অপরদিকে, জনসংখ্যার সিংহভাগ নিয়ে গঠিত তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল সম্পূর্ণ সুবিধাহীন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম শোষিত।

(ii) রাজনৈতিক কারণ (বুঁরবঁ রাজাদের স্বেচ্ছাচারিতা):

ঐশ্বরিক রাজতন্ত্র: ফ্রান্সের বুঁরবঁ রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রেরিত দূত বলে মনে করতেন এবং তাঁদের ক্ষমতার জন্য তাঁরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না।

চতুর্দশ লুইয়ের স্বৈরাচার: সম্রাট চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫) ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে নিজেকেই আইনের উৎস মনে করতেন এবং বলতেন, ‘আমিই রাষ্ট্র।

পরবর্তী রাজাদের অযোগ্যতা: চতুর্দশ লুইয়ের পর পঞ্চদশ লুই অযোগ্য ও চরম বিলাসী শাসক ছিলেন এবং একাধিক নিষ্ফল যুদ্ধে জড়িয়ে ফ্রান্সকে আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দেন।

(iii) প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা:

ত্রুটিপূর্ণ শাসন ও বিচার ব্যবস্থা: ফ্রান্সে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নীতি ছিল না

দেশের শাসনভার যাদের হাতে ছিল, সেই আঞ্চলিক প্রশাসক বা ‘ইন্টারডেন্ট’-রা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বার্থলোভী হয়ে উঠেছিলেন।

আইনের জটিলতা: সমগ্র ফ্রান্সে প্রায় ৪০০ প্রকার আইন প্রচলিত ছিল এবং এক অঞ্চলের অপরাধ অন্য অঞ্চলে আইনসম্মত বলে বিবেচিত হতো এই আইনগুলি ল্যাটিন ভাষায় রচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা অসম্ভব ছিল।

(iv) দার্শনিকদের ভূমিকা: মঁতেস্কু, ভলতেয়ার এবং রুশোর মতো মহান ফরাসি দার্শনিকদের বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা ফরাসি সমাজের পুরাতন ব্যবস্থার ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাঁদের যুক্তি ও মননশীল চিন্তাধারা জনগণকে রাজতন্ত্র ও চার্চের অন্ধভক্তি থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার বাণী শিখিয়েছিল।

(v) আর্থিক সংকট ও সমসাময়িক কারণ: আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার ফলে ফ্রান্সের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। এই চরম আর্থিক সংকট দূর করার জন্য রাজা ষোড়শ লুই ক্রমান্বয়ে তুর্গো, নেকার, ক্যলন ও ব্রিয়েনকে দায়িত্ব দেন।

কিন্তু অর্থমন্ত্রীদের কর আরোপের প্রস্তাব যাজক ও অভিজাতরা তীব্র প্রতিরোধ করে প্রত্যাখ্যান করেন নিরুপায় হয়ে রাজা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে দীর্ঘ ১৭৫ বছর পর ‘স্টেটস জেনারেল’ (জাতীয় সভা) এর অধিবেশন ডাকতে বাধ্য হন, যা বিপ্লবের দামামা বাজিয়ে দেয়।

(খ) রাজার স্বেচ্ছাচারিতা এবং দার্শনিক বুদ্ধিজীবীদের রচনা কীভাবে বিপ্লবীদের প্রভাবিত করেছিল, আলোচনা করো।

উত্তরঃ এই বিপ্লবীদের প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসন যেমন ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল, তেমনই ফরাসি দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের লেখনী সেই ক্ষোভকে বিপ্লবের রূপ দিতে সাহায্য করেছিল।

(i) রাজার স্বেচ্ছাচারিতার প্রভাব:

ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও একনায়কতন্ত্র: বুঁরবঁ রাজবংশের রাজারা চরম স্বৈরাচারী শাসন চালাতেন এবং প্রজাদের কল্যাণকামনার চেয়ে নিজেদের ভোগবিলাসকে প্রাধান্য দিতেন।

লেটারস ডি কেসে’ নামক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে যেকোনো নিরীহ নাগরিককে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখা হতো। রাজার এই স্বেচ্ছাচারিতা ও অন্যায্য ক্ষমতার ব্যবহার জনগণের মনে রাজার ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা জন্ম দেয়।

(ii) দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের রচনার প্রভাব: ফরাসি বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিকরা সরাসরি বিপ্লবে যোগ না দিলেও তাঁদের লেখনী বিপ্লব সৃষ্টির পরিবেশ প্রস্তুত করেছিল।

মঁতেস্কু: পেশায় আইনজীবী মঁতেস্কু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ (The -এ রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতার তীব্র সমালোচনা করেন এবং শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ অর্থাৎ ‘ক্ষমতার বিভাজন নীতি’-র কথা বলেন। 

ভলতেয়ার: ভলতেয়ার তাঁর ব্যঙ্গাত্মক রচনার মাধ্যমে তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চের দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা ও যাজক সম্প্রদায়ের কুৎসিত জীবনযাত্রাকে সর্বসমক্ষে নিয়ে আসেন। 

তিনি মানুষের ধর্মীয় সহনশীলতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেন

(গ) ফ্রান্সের জাতীয় সভার কার্যাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

উত্তরঃ ফ্রান্সের জাতীয় সভার কার্যাবলীর আলোচনা করা হলো:

(i) সামন্ততন্ত্রের অবসান: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট জাতীয় সভায় যাজক ও অভিজাতরা তাঁদের বহুদিনের ভোগ করা বিশেষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে সম্মত হন এর ফলে ফ্রান্স থেকে সামন্তপ্রথা, কর্ভি বা অবৈতনিক শ্রম এবং কৃষকদের ওপর চাপানো অন্যায় কর সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয় এবং ফ্রান্সে আইনি সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

(ii) মানব ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট জাতীয় সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রচার করে যা ‘মানব ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা’ নামে পরিচিত রুশোর দর্শনে অনুপ্রাণিত এই দলিলের মূল কথা ছিল— মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মায় এবং আইনের চোখে সবাই সমান।

(iii) প্রশাসনিক সংস্কার: জাতীয় সভা ফ্রান্সের প্রাচীন ও বিশৃঙ্খল প্রশাসনিক এলাকাগুলি বিলুপ্ত করে সমগ্র দেশকে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মোট ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে বিভক্ত করে।

(iv) আর্থিক সংস্কার ও অ্যাসাইনেট মুদ্রা: ফ্রান্সের চরম আর্থিক বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতীয় সভা চার্চের বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে।

(ঘ) ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তরঃ ফরাসি বিপ্লবের প্রধান ফলাফলগুলি আলোচনা করা হলো:

(i) স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতন ও নিয়মতান্ত্রিক শাসন: এই বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে দীর্ঘদিনের বুঁরবঁ রাজবংশের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে রাজার ‘ঐশ্বরিক অধিকার’ বা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং রাজতন্ত্রের পরিবর্তে জনগণের সম্মতি ও সংবিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার গণতান্ত্রিক ধারণার জন্ম হয়।

(ii) সামন্তপ্রথার চূড়ান্ত অবসান: ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম সেরা কীর্তি হলো সামন্তবাদের বিলুপ্তিবিপ্লবের কারণে অভিজাত ও যাজকদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ শেষ হয় এবং কৃষকেরা সামন্তপ্রভুদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে জমির অধিকার লাভ করে এর ফলে সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার জায়গায় আধুনিক পুঁজিবাদ এবং অবাধ বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

(iii) সামাজিক সমতা ও আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা: সমাজে জন্মসূত্রে যে শ্রেণীবিভাগ ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অধিকার ছিল, তা সম্পূর্ণ দূর করা হয় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য আইনের চোখে সমান অধিকার স্বীকৃত হয়।

(iv) ধর্মনিরপেক্ষতার উন্মেষ: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে চার্চ এবং যাজক সম্প্রদায়ের অযাচিত কর্তৃত্ব ও শাসনের অবসান ঘটে জাতীয় সভা চার্চের বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ধর্মের পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে।

(ঙ) নেপোলিয়ন কীভাবে ফ্রান্সে ক্ষমতা হস্তগত করেছিলেন, তার আভাস দাও।

উত্তরঃ ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী চরম অস্থিতিশীলতা, শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অত্যন্ত নাটকীয় ও সুপরিকল্পিত উপায়ে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। 

তাঁর ক্ষমতা হস্তগত করার প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

(i) ডিরেক্টরি শাসনের চরম ব্যর্থতা (১৭৯৫-১৭৯৯): রবসপিয়েরের পতনের পর ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে ৫ জন সদস্যের গঠিত ‘ডিরেক্টরি শাসন’ প্রবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল, অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত।

(ii) নেপোলিয়নের সামরিক কৃত্বিত্ব ও জাতীয় বীরের মর্যাদা: কর্সিকা দ্বীপে জন্ম নেওয়া নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে অসামান্য বীরত্বের পরিচয় দেন।

(iii) ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে প্রত্যাবর্তন: ফ্রান্সে ডিরেক্টরি শাসনের চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিয়ে নেপোলিয়ন ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে মিশর থেকে প্যারিসে ফিরে আসেন ফরাসি জনগণ দেশের এই শোচনীয় অবস্থায় নেপোলিয়নকে বিপুল উদ্দীপনায় স্বাগত জানায় এবং দেশ বাঁচানোর জন্য তাঁর ওপর ভরসা রাখে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Scroll to Top