Class 12 Bengali Chapter 20 রচনা

Class 12 Bengali Chapter 20 রচনা | Class 12 Bengali Question Answer to each chapter is provided in the list so that you can easily browse throughout different chapter Assam Board HS 2nd Year Bengali Chapter 20 রচনা Notes and select needs one.

Join Telegram channel

Class 12 Bengali Chapter 20 রচনা

Also, you can read the SCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions. Here we have given Assam Board Class 12 Bengali Chapter 20 রচনা Solutions for All Subject, You can practice these here.

রচনা

Chapter: 20

বাংলা (MIL)

গোট – ৫

অসমের চা শিল্প চা শিল্প ।

উত্তরঃ অসমের এক অতি প্রাচীন এবং উল্লেখযোগ্য শিল্প । পৃথিবীতে চা – এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অসমের চা এর এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে । বর্তমান পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কাছে এক অতি আবশ্যকীয় পানীয় হল চা । 

ভাত ছাড়াও চীন , জাপান , রাশিয়া , শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে চা উৎপন্ন হয় । ভারতের ভিতর অসম , পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি অঞ্জলে চা উৎপন্ন হয় । ভারতে উৎপাদিত মোট চা এর ৬০ শতাংশ অসমে উৎপন্ন হয় । 

পাহাড়ের গায়ের ঢালু জমি চা চাষের পক্ষে সব থেকে উপযোগী । অসমে এইরূপ জমি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় । একই সঙ্গে পাহাড়ের এই ঢালু জমিতে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন কিন্তু সেই জল জমে থাকলে চলবে না , অসমে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় । অর্থাৎ চা চাষ এর পক্ষে অসমের মাটি এবং জলবায়ু খুবই উপযোগী । 

অসমে চা চাষ আরম্ভ হয় ইংরেজ আমলে । ইংরেজরা প্রথমে অসমে পরীক্ষামূলকভাবে চা গাছের চাষ আরম্ভ করেছিল । কিন্তু প্রথম অবস্থাতেই প্রচুর লাভ হওয়ার ফলে তারা শীঘ্রই প্রচুর পরিমাণে চা চাষ আরম্ভ করে এবং অসমে চা শিল্প গড়ে উঠে । ধীরে ধীরে এই শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে । প্রথমে এই শিল্পের জন্য শ্রমিকের অভাব ছিল , কারণ স্থানীয় লোকেরা ধান চাষ বাদ দিয়ে চা চাষ করতে আগ্রহী ছিল না । সেজন্য ইংরেজরা বিহার , উত্তর প্রদেশ , মধ্যপ্রদেশ । প্রভৃতি জায়গা থেকে প্রচুর শ্রমিক নিয়ে আসে চা শিল্পের জন্য । এইসকল শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে চা শিল্প ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং উন্নত হতে থাকে । বর্তমানে অসমে চা রপ্তানি করে প্রচুর লাভ হচ্ছে । 

বছরে চারবার করে চা পাতা সংগ্রহ করা হয় । শ্রমিকদের চা পাতা তোলার দৃশ্য মনোরম । একসঙ্গে দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি গাছ থেকে তোলা হয় । এই চা পাতা গাছ থেকে তোলার পরে রোদে শুকিয়ে মেসিনে গুঁড়া করা হয় ।

গরম জলের মধ্যে এই গুঁড়া চা পাতা , চিনি , দুধ দিয়ে ফুটিয়ে চা প্রস্তুত করা হয় । অনেকে আবার শুধু চিনি ও চা পাতা জলে ফুটিয়ে লেবুর রস দিয়েও খান । চা – এর অনেক উপকারিতা আছে । চা খেলে দেহ এবং মনের অবসাদ দূর হয় । চা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয় । অসমের চা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে । 

অসমের অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চা শিল্পের এক বিরাট অবদান আছে । অসমে চা বাগান গুলোতে প্রচুর শ্রমিক কাজ করে । কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থা খুবই দরিদ্র । শ্রমিকদের অবস্থায় উন্নতি হলে অসমের চা শিল্পেরও সামগ্রিকভাবে উন্নতি সম্ভব হবে । 

শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ।

উত্তরঃ ১৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে আসামের নগাঁও জেলার আলিপুখুরি নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম কুসুমবর ভূঁইয়া ও মায়ের নাম সত্যসন্ধ্যা । শৈশবকালে শঙ্করদেব পিতামাতাকে হারিয়ে পিতামহী খেরসূতী কর্তৃক লালিত পালিত হন । বাল্যকালে তিনি ছিলেন খুবই দুরন্ত স্বভাবের । সে জন্য কিছুটা বিলম্বে তাঁর বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয় । তেরো বছর বয়সে তাঁকে মহেন্দ্র কন্দলীর পাঠশালায় ভর্তি করা হয় । মহেন্দ্র কন্দলীর পাঠশালায় পড়াকালীন সময়ে তিনি আটপংক্তি বিশিষ্ট একটি ঈশ্বর স্তোত্র রচনা করে সবাইকে বিস্মিত করে দেন এবং এর ফলে গুরুর কাছ থেকে ‘ দেব ’ উপাধি লাভ করেন । 

শঙ্করদেব ছিলেন একই সঙ্গে গৃহী ও সন্ন্যাসী । তাঁর প্রথমা স্ত্রী একটি কন্যা সন্তান রেখে মারা গেলে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন । দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে তিনি তিনটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান লাভ করেন । সংসার ধর্ম রক্ষা করে চললেও তিনি মূলত একনিষ্ঠ আধ্যাত্ম সাধনা ও বিদ্যাচর্চায় রত ছিলেন । বিভিন্ন শাস্ত্র ও ধর্মচর্চা করে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে ঈশ্বর সর্বব্যাপ নিরাকার ও অব্যক্ত । তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম ‘ নব বৈষ্ণবধর্ম ’ বা ‘ এক শরণ ধর্ম ’ নামে পরিচিত । চৈতন্য দেবের বৈষ্ণব ধর্মের মতো শঙ্করদেবের ধর্মাদর্শও ছিলেন সম্বনরবাদীও সর্বমানবিক । 

শঙ্করদেব শুধু ধর্মীয় জীবনের পরিত্রাতা হিসাবেই নয় , অসমীয়া সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপয়িতা রূপেও স্মরণীয় হয়ে আছেন । তাঁর সাহিত্য কীর্তি অসমীয়া সাহিত্যের পরমসম্পদ হিসাবে 

আজও সমাদৃত হয়ে আছে । তিনি সর্বমোঠ পঁয়ত্রিশটি গ্রন্থ রচনা করেছেন । তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে গদ্যগ্রন্থ কাব্য নাটক প্রভৃতি রয়েছে । শঙ্করদেব রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ভক্তিরত্নাকর , ভাগবতপুরাণ, হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান , কালীয় দমন , রুক্মিণী হরণ পারিজাত হরণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য । তাঁর রচিত নাটকগুলো ‘ অংকীয়া নাটক ‘ নামে পরিচিত । শঙ্করদেব রচিত ‘ বরগীত ’ অসমের সমাজ জীবনে মঙ্গল – সংগীত হিসাবে সমাদৃত হয়ে আসছে । 

১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১১৯ বছর বয়সে কোচবিহারের ভেলামপুরিতে শঙ্করদেবের মহাপ্রয়াণ ঘটে । সমাজ , সাহিত্য , ধর্ম , সর্বক্ষেত্রেই তিনি আসামবাসীকে আলোকের সন্ধান এনে দিয়েছেন । তাঁর পূণ্যস্মৃতির প্রতি রইল আমাদের স্বশ্রদ্ধ প্রণাম । 

তোমার প্রিয় লেখক ।

উত্তরঃ প্রতিটি পাঠকেরই এক একজন প্রিয় লেখক থাকেন । ব্যক্তিগত রুচি , মানসিকতা ও জীবনবোধ অনেক লেখকের মধ্যে বিশেষ কোন লেখককে একজনের কাছে প্রিয় করে তোলে । এই হিসেবে আমার প্রিয় লেখক হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় । 

আমি তারশঙ্করের লেখা রাইকমল , কবি , ধাত্রীদেবতা , কালিন্দী , গণদেবতা , পনগ্রাম , হাঁসুলি বাঁকের উপকথা , বেদেনী তামসতপস্যা , আরোগ্য নিকেতন প্রভৃতি অধিকাংশ উপন্যাসই পড়েছি । এই সকল উপন্যাস তাঁর কাহিনির বৈচিত্র্য , বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী , বলিষ্ঠ , জীবনবোধ , গভীর যুগ সচেতনতার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি । কোন উপন্যাসে দেখা যায় গায়ক , কবির অপূর্ব প্রেম সাধনা আবার কোন উপন্যাস সামন্ততান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তির দ্বন্দ্ব । তারাশঙ্কর এই যুগের মর্মস্পন্ধন যথার্থ অনুধাবন করে সাহিত্যের মধ্যে তার রূপায়তি করেছেন । 

তারশঙ্করের উপন্যাসগুলো যেন এক বিচিত্র বর্ণাঢ্য চরিত্রের গণমিছিল । তাঁর উপন্যাসে আছে অভিজাত ও অনিভজাত দুই শ্রেণির বিচিত্র চরিত্র । জমিদার , প্রজা , শ্রমিক , সাঁওতাল , বাজিকর , বেদে , বৈষ্ণব , বাউল, যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি বিচিত্র চরিত্র তাঁর উপন্যাসে আপন আপন বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল । শুধু চরিত্রের বৈচিত্র্যে নয় , জীবনের অভিজ্ঞতা স্পর্শে তাঁর প্রতিটি কাহিনি যেন সজীব ও মর্মস্পর্শী । তিনি তাঁর উপন্যাসে সুন্দরের পাশাপাশি অসুন্দরের জীবনচিত্র ও যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । তারাশঙ্করে উপন্যাসে কোথাও কৃত্রিমতা নেই , তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে সজীবতা ধরা পড়ে । তিনি যথার্থ জীবনশিল্পী । 

অসমের বিহু উৎসব ।

উত্তরঃ প্রত্যেক দেশেই এমন এক একটি উৎসব থাকে যার মধ্য দিয়ে দেশের অধিবাসীদের সামগ্রিক পরিচয় ফুটে উঠে । এই ধরনের উৎসবকেই জাতীয় উৎসবের মর্যাদা দেওয়া হয় । এদিক থেকে দেখলে বিহু উৎসবকেই আসামের জাতীয় উৎসব বলতে হয় । কারণ এই উৎসবটির মধ্য দিয়ে সমস্ত অসমীয়া জাতির ধর্ম সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের সুন্দরে রূপটির প্রকাশ ঘটে থাকে । 

উৎসবের কাল :- বিহু শব্দটি ‘ বিষুব ’ শব্দের রূপান্তর । প্রতি বৎসরে বিষুব সংক্রান্তি অর্থাৎ চৈত্র ‘ মাসের সংক্রান্তি দিনে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় বলে এই নামে পরিচিত । চৈত্র মাসের বিহুছাড়া আরো দুটি বিহু উৎসব প্রচলিত আছে । পৌষ সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় ‘ ভোগালী বিহু ’ এবং আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি দিবসে অনুষ্ঠিত হয় ‘ কাতি বিহু ’ । চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত বিহু উৎসবটি ‘ রঙালি ’ বিহু নামে পরিচিত এবং ব্যাপকতা ও বর্ণাঢ্যে এটাই আসামের জনসমাজে প্রধান উৎসবের স্থান অধিকার করেছে । 

উৎসবের বিবরণ :- ‘ রঙালি বিহু ‘ চৈত্র সংক্রান্তিতে শুরু হয় এবং বৈশাখের সপ্তম দিবসে সম্পন্ন হয় । ‘ রঙালি ‘ কথাটির মধ্যে যে আনন্দময়তার ইঙ্গিত আছে রঙালি বিহুতে তারই অবাধ প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় । বাসন্তী প্রকৃতির মনোরম পটভূমিকায় এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় । পত্র পুষ্প বিভূষিত প্রকৃতির আনন্দময়তা আবার বৃদ্ধ নর – নারীর হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়ে সকলকে আনন্দে মাতোয়ারা করে তোলে । পুন্যস্থান , দান – ধ্যান , পূজার্চনা প্রভৃতি কাজ কর্মের মধ্য দিয়ে উৎসবের প্রথম দিনটি অতিবাহিত হয় । গবাদি পশুর প্রতিও এই দিন বিশেষ যত্ন লওয়া হয় । দ্বিতীয় দিন হতে নৃত্য সংগীতের মধ্য দিয়ে সপ্তাহব্যাপী প্রমোদ উৎসবের সূত্রপাত হয় । নূতন বসন পরে আবাল বৃদ্ধবনিতা উৎসব আঙ্গিনা সমবেত হয় । বাঁশির সুরে মাদলের আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখর হয়ে উঠে । প্রিয়জনকে ‘ গামছা ’ উপহার দেওয়া এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ ।

‘ কাতি বিহু ’ বা কঙ্গালী বিহু ধনদাত্রী লক্ষ্মী দেবীর কাছে শস্য সম্পদ প্রার্থনা করা হয় । পৌষ সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত বিহু উৎসবে আনন্দ ভোজন প্রাধান্য পায় , তাই বোধহয় এর নাম ভোগালী বিহু । শস্য ভাণ্ডারের শস্য সঞ্চয়ের পরে প্রিয় পরিজনকে ভোজনে পরিতৃপ্ত করার আনন্দ লাভ এর প্রধান উদ্দেশ্য । 

উৎসবের তাৎপর্য :- বিহু উৎসব মূলত গ্রামীণ মানুষের কৃতি উৎসব।এর মধ্য দিয়ে ঋতুর আহ্বান , মৃত্তিকার উর্বরতা প্রার্থনা , শস্য সংগ্রহের অভিলাষ ইত্যাদি সামাজিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছে । এগুলিকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক শুভ কামনা ও সামাজিক মিলনের অবকাশ ঘটে । তদুপরি নৃত্যে সংগীতাদিতে শিল্প সংস্কৃতির বিশিষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় । বস্তুত বিহু উৎসবে আসামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিধৃত রয়েছে । 

উপসংহার :- কালের পরিবর্তনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী ও রীতি – নীতির পরিবর্তন ঘটে । দেশের উৎসব কলা ও এই পরিবর্তনের প্রভাব অস্বীকার করতে পারে না । তাই আসামের জাতীয় উৎসব বিহুর বাইরে কোথাও আধুনিকতার ছাপ পড়েছে কোথাও বা প্রমোদ অনুষ্ঠানের প্রকৃতিগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে । কিন্তু প্রকৃতির ক্রোড়ে লালিত গ্রামীণ জীবনে বিহু উৎসবের অমলিন আনন্দ ধারা আগের মতোই প্রবাহমান । 

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ।

উত্তরঃ ভূমিকা :- আমরা ও আমাদের চারপাশের বাতাস , মাটি , জল, প্রাণীজগৎ , উদ্ভিদ জগৎ প্রভৃতি জৈব ও অজৈব উপাদানের সন্মিলিত রূপই হল আমাদের পরিবেশ । প্রাকৃতিক ভাবেই প্রকৃতির নানা উপাদানসমূহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রয়েছে । আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদানের আনুপাতিক উপস্থিতি ও স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ একান্ত জরুরিও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে পরিবেশের স্বাভাবিক স্থিতি বিঘ্নিত হয়ে পড়ার আশাঙ্কা রয়েছে, তাই আমাদেরকে পরিবেশ সচেতন হয়ে উঠতে হবে । 

প্রদূষিত হওয়ার কারণ :- পরিবেশের প্রধান উপাদানসমূহ হল জল , বাতাস , মাটি , শব্দ প্রভৃতি । পরিবেশের এসব উপাদান ছাড়া আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকাই সম্ভব নয় । তবুও আমরা নানা ভাবে এগুলোকে দূষিত করে তুলেছি । সভ্যতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বসতি স্থাপন, কলকারখানা নির্মাণ , রাস্তা – ঘাট তৈরি ঘরবাড়ি ও আসবাব পত্র প্রভৃতির প্রয়োজনে নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করে চলেছি , এরফলে গাছ – পালার সাহায্যে বাতাস পরিশুদ্ধ থাকতে পারছে না । বাতাসে কার্বন – ডাই – অক্সাইড এর পরিমাণ ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে । যা মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণীকূলের পক্ষেখুব মারাত্মক । 

একই ভাবে মানুষের তৈরি অসংখ্য যানবাহন , কলকারখানা , গবেষণাগার প্রভৃতি থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসকে আরও বেশি প্রদূষিত করে তুলেছে । কল – কারখানা ও গবেষণাগার থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ শহরাঞ্চলের আবর্জনা রাশি , কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীট নাশক নদ – নদীর জলের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে জলকে প্রদূষিত করছে । এসব বর্জ্য ও আবর্জনা , বিশেষত অবাধে প্লাষ্টিকের ব্যাগের ব্যবহার মাটিকে প্রদূষিত করে মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট করে দিচ্ছে । কল – কারখানা শব্দ , যান বাহনের হর্ণ ও আওয়াজ , মাইক্রো ফোনের ব্যবহার প্রভৃতি শব্দের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়ে শব্দকেও প্রদূষিত করছে । এভাবেই মানুষের নানা লাগামছাড়া আচরণ পরিবেশ প্রদূষণের অন্যতম তথা একমাত্র কারণ । 

প্রদূষণের প্রভাব :- বাতাসে কার্বন – ডাই – অক্সাইড এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে শ্বাসকষ্ট হাঁপানি প্রভৃতি রোগের প্রাদুর্ভাব যেমন দেখা দিচ্ছে তেমনি অবাধে বৃক্ষ ছেদনের ফলে বৃষ্টিপাতের মাত্রা কমে যাচ্ছে ও গোলকীয় উত্তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে । যান বাহন ও কল কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ওজন স্তরে অসংখ্য ছিদ্র করে দিয়ে সূর্যের ক্ষতিকারক অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে চলে আসার পথ করে দিচ্ছে । শব্দ দূষণের ফলে শব্দের তীব্রতা বেড়ে গিয়ে মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে । প্রদূষিত জল মানুষের মধ্যে নানা প্রকার রোগ ব্যাধির সৃষ্টি করছে । মাটি প্রদূষিত হওয়ার ফলে মাটির উর্বরা শক্তি কমে গিয়ে সফল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে । ফলে পৃথিবীতে খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি দেখা দিচ্ছে । পরিবেশ প্রদূষণের ফলে শুধুমাত্র মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এমন নয় গোটা প্রাণীজগত ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে । 

প্রতিকার :- মানুষের কার্যকলাপের মধ্য দিয়েই যেহেতু পরিবেশ প্রদূষিত হচ্ছে অতএব এর প্রতিকার কল্পে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিকাজে রাসায়নিক সার এর পরিবর্তে জৈব সার ব্যবরা করতে হবে । কলকারখানা ও গবেষণাগার সমূহের বর্জ্য পদার্থসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে হবে । আবর্জনাসমূহ যত্রতত্র না ফেলে সেগুলো এক জায়গায় জমিয়ে রেখে জৈব সারে রূপান্তরিত করে নিতে হবে । অবাধে প্লাষ্টিক ব্যাগের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে । বৃক্ষ ছেদন বন্ধ করতে হবে । নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদে বৃক্ষছেদন করতে হলে সঙ্গে সঙ্গে পরিপুরক বৃক্ষরোপণ করতে হবে । সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে । পরিবেশের সঙ্গে আমাদের জীবন ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত একথাটা মানুষের চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে । 

উপসংহার :- পরিবেশ সম্পর্কে আজ সারা বিশ্বের সচেতন মানুষেরা চিন্তিত । পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে চলেছেন । বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা রাষ্ট্রসংঘ ৫ জুন তারিখটিকে বিশ্বপরিবেশ দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছে । তবে এই একটা মাত্র দিন পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করলে হবে না । আমাদের নিত্যদিনের কার্যসূচিতে পরিবেশ সুরক্ষার কথাটা মনে রাখতে হবে । আঞ্চলিক স্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত পরিবেশ সুরক্ষার কার্যকরী স্বেচ্ছসেবী সংগঠন গঢ়ে তুলতে হবে । ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া বর্তমান প্রজন্মের মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য। 

দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের প্রভাব ।

উত্তরঃ ভূমিকা :- বর্তমান সভ্যতা মানুষের বহু শতাব্দীর স্বপ্ন ও সাধনার ক্রমপরিণাম । মানুষ তার যুগ – যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনার অনবদ্য ফসল দিয়ে গড়ে তুলেছে সভ্যতার এই বিশাল ইমারৎ । আপনার প্রাণশক্তি তিল তিল দান করে , বুকের রক্ত বিন্দু বিন্দু ঢেলে দিয়ে সে রচনা করেছে সভ্যতার এই তিলোত্তমা মূর্তি । সে সভ্যতার বেদীমূলে দিয়েছে তার বাহুর শক্তি , মস্তিষ্কের বুদ্ধি , ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি এবং হৃদয়ের ভালোবাসা । বিজ্ঞানও মানুষের অতন্দ্র সাধনার ফসল । কালক্রমে , মানুষ বিজ্ঞানকে তার সভ্যতার বিজয় রথের বাহন করে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে এসে উপনীত হয়েছে বর্তমানের পাদপীঠতলে । বলা বাহুল্য , মানুষের সভ্যতার এই চরম সমুন্নতির মূলে রয়েছে বিজ্ঞানের অপরিসীম বিস্ময় । 

বিজ্ঞানের আবিষ্কার :- আজ বিজ্ঞান দুর্জয় হলেও পৃথিবীতে তার সূচনা হয়েছিল অত্যন্তদীনভাবে । সর্বত্যাগী জ্ঞান – তপস্বীদের যুগ – যুগান্তরের সাধনায় বিজ্ঞান রূপকথার দৈত্যপুরী থেকে সংগ্রহ

করে এনেছে সোনার কাঠি এবং বাপোর কাঠি । তা হস্তগত করে সভ্যতার প্রত্যুষ – লগ্নের সেই অসহায় মানুষ আজ অসীম শক্তিধর । সেদিনের অরণ্যচারী , গুহাবাসী মানুষ আকাশে মেঘ ও বিদ্যুৎ দেখলে ভয় পেত । আজ মানুষ বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান হয়ে সেই মেঘকে করেছে বশীভূত , বিদ্যুৎকে করেছে পদানত । 

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা :- বিজ্ঞানের বলে মানুষ আজ খনির অন্ধকারে আলো জ্বেলেছে । ঘুম ভাঙিয়েছে পাতালপুরীর ঘুমন্ত রাজকন্যার । দৈত্যপুরীর বন্দীশালা থেকে মুক্ত করে এনে তাকে পরিকল্পনা মতো সাজিয়েছে , উদ্ভাবন করেছে উৎপাদনের নব নব প্রকরণ , পৃথিবীর শৈশবের জড়তা কাটিয়ে এনে দিয়েছে যৌবনের অনেক উল্লাস । অন্যদিকে , বিজ্ঞানের শক্তিবলে মানুষ উচ্ছৃঙ্খল নদী স্রোতকে বশীভূত করে ঊষর মরু প্রান্তরকে করেছে জলসিক্ত , ভূগর্ভের জমা শস্য সম্ভাবনাকে করে তুলেছে সফল , দূরে সরিয়ে দিয়েছে ধরিত্রীর অনুর্বরতার অভিশাপ । বিজ্ঞান আজ উর্বরতা দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু বসুধাকে শস্যবতী করে তুলেছে । নতুন নতুন যন্ত্রপাতি আবিষ্কার দ্বারা সে উৎপাদন জগতে এনেছে যুগান্তর এবং সুদূরকে করেছে নিকটতম । 

মানব – জীবনে বিজ্ঞানের অবদান :- বিজ্ঞানের সাফল্যে জীবধাত্রী বসুধা আজ কলহাস্যমুখর । প্রাগৈতিহাসিক মানবের অগ্নি – আবিষ্কারের দিন থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের অতন্ত্র সাধনা বিজ্ঞানকে করেছে সমৃদ্ধ , সভ্যতাকে করেছে জঙ্গম । বাষ্পীয় শক্তিকে সে করেছে বশীভূত , বিদ্যুৎকে করেছে করায়ত্ত , মুঠোয় পুরে নিয়েছে পারমাণবিক শক্তিকে । ডাঙ্গায় ছুটেছে মোটর – ট্রেন , জলে ঢেউ এর ঝুঁটি জাপটে ধরে জাহাজ ছুটে চলেছে , আকাশ তোলপাড় করে উড়ে চলেছে শব্দের চেয়েও দ্রুতগামী বিমান – পোত , মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছে রকেট – স্পুটনিক মহাকাশযান । অন্যদিকে , বিজ্ঞান সাবিত্রীর মতো মৃত্যুর গ্রাস থেকে জীবনকে বাঁচিয়ে তুলতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । 

প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞানের অবদান :- আজ জীবনের সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবিসংবাদিত প্রভুত্ব । প্রভাতের শয্যাতাগ থেকে নিশীথের শয্যা গ্রহণ পর্যন্ত বিজ্ঞান মানুষের অত্যন্ত অনুগত অনুচর । রেডিওর প্রভাতী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাগলো তার । বিজ্ঞানের কৌশলে ততক্ষণে কলে জল এসেছে । প্রয়োজনমতো কখনো সে জল উষ্ণ , কখনো বা শীতল । মাথার উপরে ঘুরছে সুদৃশ্য বৈদ্যুতিক সাখা , রেডিওতে বাজছে বিচিত্র সুরের গান । কোথাও বা দূর দূরান্তের ছবি ও বাণী চক্ষের নিমেষে উদ্ভাষিত হয়ে উঠল টেলিভিশনের পর্দায় । প্রতিদিন বাজারে যাবার প্রয়োজন নাই । বিজ্ঞানের দৌলতে ফ্রীজের মধ্যে বাজারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী অবিকৃত অবস্থায় রাখা হয়েছে । এদিকে বৈদ্যুতিক বা গ্যাসের উনানে চা – কফির জল গরম হলো , প্রস্তুত হলো প্রাতরাশ ; সামনের টেবিলে সংরক্ষিত সংবাদপত্র তাও বিজ্ঞানের অবদান । 

এক পাশে রক্ষিত নীরব টেলিফোনটি সহসা বেজে উঠলো । তাতে ভেসে এলো হাজার মাইল দূরের বন্ধুর কণ্ঠস্বর । ইতিমধ্যে কলিংবেল বেজে উঠলো । কোন অতিথি সাক্ষাৎ প্রার্থী । অতিথির সঙ্গে আলাপান্তে ঘড়িতে চোখ পড়ল । এদিকে বিজ্ঞানের দৌলতে বাথরুমে স্নানের জল প্রস্তুত । স্নানাহার সেরে বাইরে যেতে হবে । পোশাক – পরিচ্ছদ আগে থেকেই ওয়াশিং মেশিনে কেচে ইলেকট্রিক ইস্ত্রিতে ইস্ত্রি করে রাখা হয়েছে পরিপাটি করে । বিজ্ঞানের কল্যাণে কোন কোন পোশাক – পরিচ্ছদের আবার ইস্ত্রি করবার প্রয়োজনই হয় না । যাই হোক , দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি । সে সৌভাগ্য যাদের নেই , তাদের জন্যে রয়েছে ইলেকট্রিক ট্রেন , ট্রাম , বাস বা ট্যাক্সি । অফিসে আলো জ্বলছে , পাখা ঘুরছে , কোন অফিস হয়ত বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত , চাবি টেপার সঙ্গে সঙ্গেই উর্ধ্বলোক থেকে লিফট নামক রথ নেমে এলো , সেই লিফ্ট তাকে নামিয়ে দিল অফিসের দ্বার প্রান্তে । 

টাইপ রাইটার এ চিঠিপত্র টাইপ করা হচ্ছে , কমপিউটারের সাহায্যে রক্ষিত হচ্ছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব । ছুটির পর আমোদ – প্রমোদের জন্য রয়েছে সিনেমা বায়োস্কোপ । ইতিমধ্যে শরীর অসুস্থ বোধ করলে আছে ডাক্তারখানা , আছে ঔষধ । রাত্রে আহারান্তে ঘুম না এলে বিজ্ঞান রেডিওর সাহায্যে শোনাবে ঘুম পাড়ানিয়া গান । ঘুমিয়ে পড়লেও বিজ্ঞান তার শিয়রে সারারাত অক্লান্ত হাতে পাখা ঘোরাবে কিংবা শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্র চালু করে মানুষের সুখ নিদ্রার ব্যবস্থা করবার জন্যে সারারাত থাকবে বিনিদ্র । 

বিজ্ঞানের বিভিষিকাময় রূপ :- এ সমস্ত হলো বিজ্ঞাননির্ভর সভ্যতার উজ্জ্বল দিক । অন্যদিকে জমেছে অনেক দুঃখ , অনেক ব্যথা , অনেক প্রবঞ্চনা । বিজ্ঞান এসে জোর করে মানুষের হাতের কাজ কেড়ে নিয়ে , তার জীবন ধারণের চাবিকাঠি অপহরণ করে তাকে নিশ্চিত অনাহারের দিকে ঠেলে দিয়েছে । সে তার শান্ত , সুন্দর সনাতন জীবন ছন্দের তার দিয়েছে ছেঁড়ে । মানুষের এই বোবা পৃথিবীর বুকে আজ সৃষ্টি করেছে এক দুরপনেয় ক্ষত । সে পৃথিবীর একদল মানুষকে ভোগ – সুখ – সর্বস্ব পশুতে পরিণত করেছে আর একদল মানুষকে পরিণত করেছে ক্ষুধার্ত আহারান্বেষী জানোয়ারে । বিজ্ঞানের এই যন্ত্রসিদ্ধ বিভীষিকা থেকে মানুষের মুক্তি নেই , নেই মুক্তি তার সর্বনাশা পরিণাম থেকে । 

বিজ্ঞানের সর্বধ্বংসী অকল্যাণ মূর্তি :- বিজ্ঞান যে সভ্যতার শরীরে জীবন প্রতিষ্ঠা করেছে , আজ তারই বিনাশে সে মেতে উঠেছে রুধির তৃষাতুর ছিন্নমস্তার মতো । মানুষের মেধা ও মনীষার যার জন্ম , তার অতন্ত্র সাধনায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা , সেই বিজ্ঞান আজ নৃশংসভাবে তার বক্ষে রক্ত পানে উদ্যত । বর্তমান শতাব্দীতে সংঘটিত দু – দুটি বিশ্ব – মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা বিজ্ঞানের দানবীয় শক্তি সম্বন্ধে মানুষের মনে এনে দিয়েছে এক ঘোরতর আতঙ্ক । আজ বিজ্ঞানের কি আকাঙ্ক্ষা ? জীবন না মৃত্যু ? সে আজ পৃথিবীতে কি চায় ? পৃথিবীর মানুষের মনে আজ জেগেছে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন । 

দোষ কার , বিজ্ঞানের , না প্রয়োগ পদ্ধতির :- কিন্তু দোষ কার ? বিজ্ঞানের , না যারা বিজ্ঞানকে স্বার্থলোলুপ দানবীয় প্রবৃত্তির চরিতার্থতার জন্য প্রয়োগ করে , তাদের ? সেই স্বার্থপর নরপিশাচদের হাতেই বিজ্ঞান বারে বারে তার কল্যাণব্রত থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পৃথিবীতে করেছে নরমেধ যজ্ঞের আয়োজন । দোষ সেই লোভী শয়তানদের সংকীর্ণ স্বার্থ – বুদ্ধির দোষ , দোষ সেই শক্তি স্পর্ধিত ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় । আজ আর বিজ্ঞানের হাত ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীতে প্রাচীনকালের অবৈজ্ঞানিক জীবনাচরণ সম্ভব নয় । কাজেই , আজ প্রয়োজন বিজ্ঞানের প্রয়োগ পদ্ধতি ও সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের। 

উপসংহার :- কিন্তু আর কতকাল বিজ্ঞানলক্ষ্মী হৃদয়হীন স্বার্থলোলুপ নরপিশাচদের গৃহে দাসীবৃত্তি করবেন ? যিনি কল্যাণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী , তিনি কি তার কল্যাণপুত দক্ষিণ হস্ত সকলে মানুষের মঙ্গলের জন্যে প্রসারিত করে দেবেন না ? বিজ্ঞান যদি সর্বধ্বংসী মারণাস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত হয়ে সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণ কর্মে ব্যবহৃত হয় , তবেই মানুষের এই দুঃখ রজনীর অবসান হবে । অভিশাপের পরিবর্তে বিজ্ঞানলক্ষ্মীর আর্শীবাদ , ঝরে পড়বে মানব জাতির মাথায় , রক্ত বিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা পাবে জীবধাত্রী বসুন্ধরা ।

সভ্যতায় বিজ্ঞানের অবদান ।

উত্তরঃ বুদ্ধি ও মননের শক্তিতে মানুষ অন্যান্য যাবতীয় প্রাণীকে অতিক্রম করিয়া দেহসর্বস্ব পশুর সংকীর্ণ স্থবির জীবন যাপনের অভিশাপ হইতে মুক্তি পাইয়াছে । তাই যাহা পাইয়াছে তাহা লইয়া মানুষের তৃপ্তি নাই । আরও জানিতে হইবে , আরও পাইতে হইবে , এই অপূর্ণ অভীপ্সাই মানুষকে কর্মচঞ্চল করিয়া রাখিয়াছে ; মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতির দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে চাহিয়াছে । জীবন নির্বাহের প্রতিটি উপকরণ বুদ্ধিবলে সংগ্রহ করিয়া প্রকৃতির সর্বাঙ্গে আনপার শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখিয়াছে । ক্রমাগত অনুশীলনে বুদ্ধি যত পরিণত হইয়াছে , ততই সুখ – স্বাচ্ছন্দ্য সমৃদ্ধি আসিয়া মানুষের কাছে ধরা দিয়াছে । অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে সভ্যতার রথচক্র । বিজ্ঞান মানব মনীষার অন্যতম অবদান রূপেই সভ্যতার অগ্রগমণ অব্যাহত রাখিয়াছে। 

বিজ্ঞানের যুগ আসলে বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীন বিকাশ ও অনুশীলনের যুগ । ইহার পূর্ব পর্যন্ত এ দেশে ‘ বেদ ’ আর ইউরোপীয় দেশগুলিতে ‘ বাইবেল ’ ছিল জীবনের যাবতীয় গতি – প্রকৃতি তথা সভ্যতা সংস্কৃতির একমাত্র নিয়ামক । জনজীবনের গভীরে প্রোথিত অন্ধ সংস্কারের মূল বিজ্ঞান আসিয়া সহজে উৎপাদন করিতে পারে নাই , প্রথম আবির্ভাব বিজ্ঞান কোন দেশেই সদার অভ্যর্থনা লাভ করে নাই । বিজ্ঞানী গ্যালিলিওৰ কারাবরণে বিজ্ঞানের প্রতি ধর্মীয় বিরূপতাই প্রকাশিত হইয়াছে । বহুতর আন্দোলন ও বিপ্লবের অধ্যায় একের পর এক পার হইয়া অবশেষে মানুষ যেদিন জীবনকে সুস্থ স্বাভাবিক সংস্কারমুক্ত দৃষ্টির আলোকে দেখিবার সুযোগ পাইয়াছে সেদিন । হইতেই বিজ্ঞানের অবাধ অভিযান আরম্ভ হইয়াছে । 

অগ্নি ও লৌহের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই যে ক্রমবর্ধমান বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই । শুধু অসীম শক্তির উৎস বাষ্পই নয় যাবতীয় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই এই দুইটি পদার্থকে অবলম্বন করিয়া প্রাথমিক উন্নতির পথে যাত্রা করে । জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় শকটই হউক আর মহাকাশচারী দুঃসাহসিকের বাহনইহউক , সর্বক্ষেত্রেই ইহাদের ভূমিকা অপরিহার্য । অষ্টাদশ – ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করিয়া মানব সভ্যতা একটির পর একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমৃদ্ধতর হইয়া চলিল এবং এই মুহূর্তেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু অক্লান্তকর্মী বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের নূতনতর দিগন্ত সন্ধানে ব্যাপৃত রহিয়াছেন । বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি কৌতূহলজনক পারস্পর্যের সূত্র ধরিয়া আবির্ভূত হয় । 

একটির সন্ধান করিতে গিয়া অন্য কোন অভাবিত তত্ত্ব আসিয়া ধরা দেয় , কোনটিকে অধিকতর উন্নত করিতে গিয়া মধ্যবর্তী স্তরে আরো বহু প্রয়োজনীয় তত্ত্বও তথ্য আবিষ্কৃত হয় । বিদ্যুৎ , তাপ , ‘ বুনসেন বার্নার ’ বিজ্ঞানের বহিরঙ্গের উপকরণ মাত্র , বিজ্ঞানীকে প্রকৃতপক্ষে কর্মে নিয়োজিত রাখে সেই জন্মসূত্রে লব্ধ মানব – মনীষা । মানব – মনীষার একটি শাখা নিজেকে বিকশিত করিয়াছে সাহিত্য শিল্পের পত্র পুষ্পে , অন্যটি আত্মনিয়োগ করিয়াছে পদার্থের অতল রহস্য সন্ধানে । এইভাবেই হৃদয় ও বুদ্ধির মিলিত বৃত্তে মানব সভ্যতা বিধৃত হইয়াছে । 

বৈজ্ঞানিকের মননজাত ফসল শুধু দৈনন্দিন জীবনকেই আরাম – বিলাসের সুখভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করে নাই , বিশুদ্ধ জ্ঞানানুশীলনের আনন্দও সরবরাহ করিয়াছে । যে জ্ঞান ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগিবে না অথচ তাহার প্রাপ্তিতে মনোলোক সমৃদ্ধ হইতে পারে আধুনিক বিজ্ঞানে তাহার সাধনায়ও অনলস । তাই বিশ্বসৃষ্টি , নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস , বিশ্ববিধান , দিবারাত্রির আবির্ভাব তিরোভাব , গ্রহ – নক্ষত্রের রহস্য , এমন কি গ্রহান্তরে যাত্রার অভিলাষেও যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবনের মধ্য দিয়া বিজ্ঞান শিক্ষা ও জ্ঞানকে স্থান – কালতিক্রমী শক্তি দান করিয়াছে , মানুষে মানুষে নৈকট্যের সেতুবন্ধন রচনা করিয়াছে । আধুনিক জগৎ যে শিক্ষার প্রসারে পূর্বাপেক্ষা অধিক সফল হইয়াছে তাহার মূলে কতকগুলি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার – – বেতার , চলচ্চিত্র , মুদ্রণযন্ত্র , ফিলম্ প্রভৃতির অবদানও উপেক্ষনীয় নয় । আনন্দদানের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান অনুরূপ সাফল্যেরই পরিচয় দিয়াছে । সুতরাং জীবনের যে সর্বতোমুখী উন্নতি আধুনিক মানব সভ্যতার বৈশিষ্ট্য তাহার মূলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের স্মরণীয় ভূমিকা সক্রিয় রহিয়াছে । 

স্মরণাতীত কাল হইতেই মানব জাতি যাবতীয় প্রতিকূলতাকে পরাভূত করিয়া মানব মহিমাকে গৌরবান্বিত করিতে চাহিয়াছে । মানব সভ্যতার ইতিহাস মানুষের সংগ্রামী প্রয়াসেরই ইতিহাস । মধ্যযুগ পর্যন্ত তাহার অগ্রগতি ধর্ম ও নানা সামাজিক কুসংস্কারের প্রাবল্যে স্বচ্ছন্দ হইতে পারে নাই , আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আলোকস্নাত পৃথিবীতে পৌঁছিয়া সে বুদ্ধির স্বাধীন অনুশীলনে মনোনিবেশ করিল । বৈজ্ঞানিক চেতনার উন্মেষই মানুষকে মোহমুক্ত বুদ্ধি ও পূর্বসংস্কারহীন দৃষ্টিভঙ্গী অর্জনে সহায়তা করিয়া মানব ধর্মকে প্রতিষ্ঠা দিয়াছে । সর্বমানবের কল্যাণভিত্তিক যে মানবতাবাদ আধুনিক যুগের বিশ্বধর্ম তাহার মূলেও বিজ্ঞানের প্রেরণা ক্রিয়াশীল । কিন্তু বিজ্ঞানের এই শুভংকর রূপই কেবল সত্য নয় , যে সভ্যতাকে ইহা নানা বিস্ময়কর অবদানে সমৃদ্ধ করিয়াছে , সেই সভ্যতার অবলুপ্তির সম্ভাবনার বীজও এই বিজ্ঞানই বহন করিতেছে । মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞানের অমূল্য চেতনা শ্রদ্ধাসহকারে স্বীকার করিয়াও বলিতে হয় যে , বর্তমান যুগের সভ্য মানুষ সর্বাঙ্গে বিজ্ঞানের কল্যাণচিহ্ন ধারণ করিয়াও অন্তরে কিন্তু আদিম যুগের পাশবিক হিংসাকে লালন করিতেছে । 

অসমের বন্যা ও তার প্রতিকার ।

উত্তরঃ বন্যাজনিত দুঃখ অসমের জনজীবনে বার্ষিক অভিশাপে পরিণত হয়েছে । প্রতি বৎসরই অসমের কোন না কোন অঞ্চল বন্যাপ্লাবিত হয়ে অধিবাসীদের জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা বহন করিয়া আনে । ভারতের আর কোনো রাজ্য এইরূপে প্রায় নিয়মিতভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয় না । সমতল ভূমির শুষ্ক প্রদেশে বসিয়া সংবাদপত্রে বর্ণনা পাঠ করিয়া অসমের বন্যার ভয়াবহতা কল্পনা করা যায় না । একাদ হোয়াংহো নদী ছিল ‘ চীনের দুঃখ ’ দামোদর নদকেও ‘ বাংলার দুঃখ ’ বলা হইত । অসমের দুঃখের মূলে কিন্তু একটি বা দুটি নদ – নদী নাই , এই রাজ্যের অগণিত পার্বত্য নদীর যে কোনোটি অবিরাম বর্ষণে প্লাবিত হইয়া দুই কুল ছাপাইয়া উঠিতে পারে । 

অসম বৃষ্টিবহুল রাজ্য । তদুপরি উত্তরতম সীমান্তের পর্বত শ্রেণীর শীর্ষদেশে তুষারের সঞ্চয়ও কম নহে । অসমের কোনো কোনো অঞ্চলে বৎসরের অধিকাংশ সময় অবিরাম বৃষ্টিপাত হয় । প্রবল বর্ষণের জলধারা নদীগুলি বহন করিয়া উঠিতে পারে না । ফলে অনিবার্যরূপেই উভয় তীর প্লাবিত হয় । ইহার সহিত আবার মাঝে মাঝে পাহাড়ের ঢল নামে । পর্বত শীর্ষের তুষারস্তূপ গলিয়া অসংখ্য নদী ঝরণা ধারায় নামিয়া আসে । তখন ব্রহ্মপুত্র ও তাহার শাখা নদীগুলিতে প্লাবনের মত উল্লাস দেখা যায় । 

গত কয়েক বছর ধরিয়া বরাক উপত্যকায় বরাক নদী বছরে একবার নহে , উপর্যুপরি কয়েকবার বন্যা সৃষ্টি করিতেছে । ইহাতে বন্যা কবলিত সমগ্র উপত্যকায় প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্দশার সন্মুখীন হয় । সম্প্রতি বরাকে বন্যার যে উন্মত্ত তাণ্ডব দেখা গিয়েছিল তাহাতে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং বহু সংখ্যক গবাদি পশুর মৃত্যু হইয়াছে । কয়েক কোটি টাকার শস্যসম্পদ নষ্ট হইয়াছে । ইহা ছাড়া কত লোক যে গৃহহারা ও সর্বস্বান্ত হইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই । প্রথমবারের বন্যা খানিকটা কমিবার পর পুনরায় বন্যার প্রকোপ দেখা যায় । 

কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার অসমের বন্যার প্রতিকারকল্পে বেশ কয়েকটি ছোট – বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছেন । কিন্তু পবনদেবের খেয়াল খুশিমত বৎসরের যে কোনো সময় অতি বর্ষণের ফলে নদীগুলি অকস্মাৎ প্লাবিত হয় বলিয়াই এই সকল প্রকল্পের স্থায়ী সুফল এখনও দৃষ্টিগোচর হয় না । খরস্রোতা পার্বত্য নদীর উপকূল বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড দিয়া বাধিবার চেষ্টা করিয়া দেখা গিয়েছে প্রচণ্ড প্লাবনে তাহা ফলপ্রসূ হয় না । ব্রহ্মপুত্রের তীরভূমির ভাঙ্গন রোধেও এই ব্যবস্থা অবলম্বিত হইয়াছে । ভারতের প্রাক্তন সেচমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ডক্টর কে . এল . রাও অসমের বন্যা প্রতিরোধে একদা প্রস্তাব করিয়াছিলেন যে , খাল কাটিয়া গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে সংযোগ সাধন করা হউক । ইহাতে বন্যার সম্ভাবনাও কমিয়া যাইবে । প্রভৃত ব্যবসাপেক্ষ বলিয়া তাঁহার এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়িত হইতে পারে নাই । 

গ্রহান্তরে পাড়ি জমাইলেও মানুষ আজও প্রকৃতির হাতে অসহায় ক্রীড়ানক। অসমের ভয়াবহ বন্যা মাঝে মাঝে আমাদের এই কথাই স্মরণ করাইয়া দেয় । তবু মানব – মনীষার উপর আস্থা রাখিয়া এই আশা প্রকাশ করা চলে যে , অসমের জনজীবন একদিন বন্যার অভিশাপ হইতে অবশ্যই মুক্ত হইবে । 

তোমার প্রিয় সাহিত্যিক ।

উত্তরঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :- বীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাকোঁ ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা ছিলেন সারদা সুন্দরী দেবী । রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুদর্শ সন্তান । জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা । ১৯৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে । পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমনের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন । রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি , নর্ম্যাল স্কুল , বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন । কিন্তু বিদ্যালয় – শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগান বাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । 

১৮৭৩ সালে এগারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়েছিল । এরপর তিনি কয়েক মাসের জন্য পিতার সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন । প্রথমে তাঁরা আসেন শান্তিনিকেতনে । এরপর পাঞ্জাবের অমৃতসরে কিছুকাল কাটিয়ে শিখদের উপাসনা পদ্ধতি পরিদর্শন করেন । ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ তথা প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ কবিকাহিনী এছাড়া এই পর্বে তিনি রচনা করেছিলেন সন্ধ্যাসংগীত কাব্যগ্রন্থটি । রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ’ এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত । 

১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যাণ্ডে যান রবীন্দ্রনাথ । প্রথমে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন । ১৮৭৯ সালে ইননিভার্সিটিড কলেজ লণ্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো শুরু করেন । কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই পড়াশুনো তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি । এই সময় তাঁর ইংল্যাওবাসের অভিজ্ঞতার কথা ভারতী পত্রিকায় পত্রাকারে পাঠাতেন রবীন্দ্রনাথ । উক্ত পত্রিকায় এই লেখাগুলি জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনাসহ প্রকাশিত হত য়ুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্রধারা নামে । ১৮৮১ সালে সেই পত্রাবলি য়ুরোপ – প্রবাসীর পত্র নামে গ্রন্থাকারে ছাপা হয় । এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম গদ্যগ্রন্থ তথা প্রথম চলিত ভাষায় লেখা গ্রন্থ । অবশেষে ১৮৮০ সালে প্রায় দেড় বছর ইংল্যাণ্ড কাটিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে এবং ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি দেশে ফিরে আসেন। 

১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ঠাকুরবাড়ির অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয় । বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী । ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে । এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে একটি আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান । ১৯০১ সালে নৈবেদ্য ও ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থের পর ১৯১০ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় । ১৯১৩ সালে গীতাঞলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে । ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘ স্যার ’ উপাধি ( নাইটহুড ) দেয় । 

১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে মার্কিন কৃষি – অর্থনীতিবিদ নেলার্ড নাইট এলমহার্স্ট , রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শান্তিনিকেতনের আরও কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথ “ পল্লীসংগঠন কেন্দ্র ” নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই সংস্থার নাম পরিবর্তন করে রাখেন “ শ্রীনিতেকন । ” 

জীবনে শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথের মোট পঞ্চাশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় । জীবনের এই পর্বে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজী “ ঈশ্বরের রোষ ” বলে অভিহিত করলে , রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজীর এই বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এভং প্রকাশের তাঁর সমালচোনা করেন । জীবনের শেষ চার বছর ছিল তাঁর ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময় । এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সুজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা । মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন । দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বিজ্ঞান – আশীর্বাদ না অভিশাপ ?

উত্তরঃ ভূমিকা :- বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনের সম্পর্ক , যার সাহায্য ছাড়া আমরা এক পাও চলতে পারি না । তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাওয়া কতখানি যুক্তি সঙ্গত , তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে । কেননা ‘ বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীৰ্বাদ ’ – এ প্রশ্ন তোলা মানেই বিজ্ঞানের কল্যাণ শক্তি সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হওয়া , প্রচলিত ধ্যান – ধারণার মাঝখানে বিরুদ্ধ মতবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া ।

বিজ্ঞান আশীর্বাদ , তার সাম্প্রতিক কিছু গতি – প্রকৃতিতে উদ্বেগ :- সচরাচর বিজ্ঞানের আর্শীবাদকেই আমরা দেখি । বিজ্ঞানের কল্যাণশক্তির বৈভব প্রতিনিয়ত আমাদের চোখ ঝলসে দেয় । বিজ্ঞান আজ কি না করছে । যানবাহন , যোগাযোগ , আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র , আমোদ প্রমোদের উগকরণ – সর্বত্র বিজ্ঞানের প্রভাব । বিজ্ঞান দূরকে নিকট করছে , নিত্য নতুন নতুন অজানা রহস্যের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়ে মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। বিজ্ঞানের দৌলতে সমাজ ও সভ্যতার চেহারাই গেছে বদলে । এই যেখানে অবস্থা , আর্শীবাদ বা প্রাপ্তিযোগেরই শুধু ছড়াছড়ি , সেখানে যে ক্ষতির প্রশ্ন উঠছে , তার কারণ , বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক কিছু গতি – প্রকৃতি দেখে মানুষ আজ উদ্বিগ্ন । এমন কি বিজ্ঞানের কাছ থেকে প্রাপ্তির নামে যা কিছু আজ চোখে পড়ছে , মানুষ তাদেরও অনেক কিছুই উপরেই আর আস্থা রাখতে পারছে না । এখানে বিজ্ঞানের গতি – প্রকৃতি নিয়ে আগে আলোচনা করা যাক । সংশয়ের প্রসঙ্গ পরে আসছে । 

পরমাণু – শক্তি , পরমাণু বোমার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা :- সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের একটি খুব বড় দিক পরমাণু বিজ্ঞান । মানুষ যেদিন থেকে পরমাণু ভাঙ্গার পদ্ধতি আবিষ্কার করল , সেদিন থেকে সে অসীম শক্তির অধীশ্বর । এই শক্তিকে কল্যাণকর্মে লাগান যায় , আবার ধ্বংসের উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা চলে । আশঙ্কার কথা এই যে পরমাণু বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র গড়ার কাজে মানুষ সম্প্রতি যে আগ্রহ দেখিয়েছে , তা শেষোক্ত উদ্দেশ্যেরই পরিপোষক । এরই মধ্যে কয়েকটি জাতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করেছে । এক একটি পরমাণু বোমার মধ্যে ধ্বংসের যে বিপুল ক্ষমতা লুকিয়ে আছে , বারুদ আবিষ্কৃত হবার পর থেকে সবগুলো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ একত্রে জুড়লেও তার সমান হবে না । অর্থাৎ , যুদ্ধ থেকে আজ অবধি সংঘটিত সবরকম বিস্ফোরণের যোগফল একটি মাত্র পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ শক্তির তুলনায় নগণ্য । আবার , পরমাণু বোমাও একটি নেই , আছে কয়েক হাজার । অতএব অনুমান করা যেতে পারে , ওদের মধ্যে গোটা পৃথিবীর কবর আগে থেকে খোড়া আছে । ওদের মাত্র কয়েকটিকে কাজে লাগালেই কয়েক কোটি মানুষকে মুহূর্তে ধ্বংস করা যাবে । আর কাজে লাগাবার ব্যবস্থাটা যদি ঘটা করে হয়তো পৃথিবী জোড়া বিরাট সভ্যতা মুছে যেতে সময় লাগবে না মোটেই ।

হিরোসিমা ও নাগাশাকির মারণযজ্ঞ :- পরমাণু বোমা প্রথম ফেলা হয় । ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ৬ ই আগষ্ট , জাপানের হিরোসিমা শহরের উপর । এই বোমাটির বিধ্বংসী ক্ষমতা ছিল ২০ হাজার টন . টি . এন . টি.র সমান । টি . এন . টি . বা ট্রাই নাইট্রো টলুইন নামক পদার্থটি তার মারাত্মক বিস্ফোরক ক্ষমতার জন্য বিজ্ঞানী মহলে সুবিদিত । এ হেন পদার্থের ২০ হাজার টন যদি একসঙ্গে কোথাও বিদীর্ণ হয় , তো অবস্থাটা কতখানি সাংঘাতিক হতে পারে , সহজেই তা অনুমেয় । ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ই আগষ্ট ঠিক একই অবস্থার সাক্ষী হয়েছে নাগাশাকি । শুধুমাত্র একটি পরমাণু বোমার আঘাতেই হিরোসিমায় ৭৮ হাজার নর – নারীর মৃত্যু হয় এবং আহত হয় ৪৮ হাজার । নাগাশাকিতে হত ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে ২৭ হাজার ও ৪১ হাজার । এছাড়া উভয় শহরের কয়েক হাজার নরনারী নিখোঁজ হয়েছিল । প্রত্যক্ষদর্শীদের মতেঃ বোমা বর্ষণের মুহূর্তে সর্বগ্রাসী এক আগুনের ঝড় হিরোসিমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে শহরটির উপর তার তাণ্ডব চলে । এই তাণ্ডব শেষ হলে দেখা যায় , হিরোসিমার ১২ বর্গ কিলোমিটার অংশ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং কর্মব্যস্ত অতি সুন্দর এক মহানগরী মহাশ্মশানের বিভীষিকা নিয়ে হাহাকার করছে । 

সাম্প্রতিক যুগের ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার :- উপরের এই বর্ণনা থেকে পরমাণু বোমার ভয়াবহ ক্ষমতা সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা করা চলে । কিন্তু মনে রাখা দরকার যে , হিরোসিমা ও নাগাশাকির উপর যে দুটি বোমা বিদীর্ণ হয়েছিল , তাদের শক্তির পরিমাপক ছিল কিলোটন । এখন ওদের চেয়ে আরও অনেক বেশী শক্তিশালী অস্ত্র তৈরী হয়েছে । রাক্ষুসে সব পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তিকে এখন ‘ মেগাটন ’ এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে । ১ মেগাটন হল ১০ লক্ষ টন বিস্ফোরক টি . এন . টি.র সমান । অর্থাৎ , এখনকার মেগাটন শক্তিবিশিষ্ট একটি পরমাণু বোমার শক্তি হিরোসিমার মৃত্যু দূতটির চেয়ে ৫০ গুণ বেশী । ১ মেগাটন তো সামান্য , ৫০ এবং এমন কি ১০০ মেগাটন শক্তিবিশিষ্ট পারমাণবিক অস্ত্র এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে । অর্থাৎ, হিরোসিমার বোমাটির চেয়ে কয়েক হাজার গুণ শক্তিশালী মারণাস্ত্র এরই মধ্যে গড়ে ফেলেছে উৎসাহীরা । 

৪১০০ মেগাটনবিশিষ্ট একটি পরমাণু বোমার শক্তি দাঁড়াবে হিরোসিমাতে বিদীর্ণ মৃত্যুদূতটির হাজার গুণ । বিশেষজ্ঞরা বলেছেন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে , তা দেখে মনে হয় , এহেন বিধ্বংসী অস্ত্র আজ পৃথিবীর যে কোন দেশের বায়ুমণ্ডলে ফাটান হতে পারে । অর্থাৎ যে কোন দেশকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মহাশ্মশানে পরিণত করা কঠিন নয় । আজ পারমাণবিক অস্ত্র গড়ার কাজে অজস্র অর্থ জলের মতো খরচ হচ্ছে এবং এরই মধ্যে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া যে পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করেছে , তা দিয়ে গোটা পৃথিবীকে কয়েক ডজন বার ধ্বংস করা যায় । 

মহাকাশ বিজয়ের দিক :- বিজ্ঞানের গতি – প্রকৃতির এই গেল একটি দিক । এছাড়া অন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মহাকাশ – বিজয় । রহস্যময় মহাকাশের বুকে মানুষ এরই মধ্যে অনেক অসাধ্য সাধন করেছে । পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে অতিক্রম করে চাঁদে পাড়ি দিয়েছে , মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠিয়েছে । কিন্তু অনেকের আজ প্রশ্ন , মহাকাশ বিজয়ের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মানুষের এমন কি উপকার হবে ? বরং উপকারের বদলে অপকারকে ডেকে আনবে না তো মানুষ ? চাঁদের দখল নিয়ে নতুন এক লড়াই বাধবে না তো ? অবশ্য অস্বীকার যায় না , অজানাকে জানবার মধ্যে কৃতিত্ব আছে । 

কিন্তু তাই বলে এত অপব্যয় ? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে মানুষ পাঠাবে বলে অ্যাপোলো প্রজেক্ট এর জন্যে যে অর্থ বরাদ্দ করেছিল , আমাদের ভারতীয় টাকার হিসাবে তার পরিমাণ দাড়ায় ৩২ হাজার কোটি । গরীব ভারত তার তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ১৫ বছরেও সমগ্র দেশের জন্যে এ পরিমাণ টাকা খরচ করতে পারে নি । তাই কেউ কেউ বলেছেন , ঘরে রুগ্ন ও বুভুক্ষু আপনজনকে রেখে কাশ্মীরে বা দার্জিলিঙে হাওয়া খেতে যাওয়া যেমন অশোভন , পৃথিবীর দুই – তৃতীয়াংশ বুভুক্ষু মানুষের কথা চিন্তা না করে হাওয়াহীন চাঁদে মানুষ পাঠানো ঠিক তেমনি অশোভন । 

বিজ্ঞান , যন্ত্র – সভ্যতা ও কৃত্রিমতা :- এই অবধি গেল বিজ্ঞানের গতি – প্রকৃতির দু – একটি দিক নিয়ে আলোচনা । এছাড়া , বিজ্ঞান থেকে আজ যা পাচ্ছি , তা নিয়েও অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে । বিজ্ঞানকে স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগাতে গিয়ে অনেকেই আজ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে , এবং আমরা হচ্ছি যান্ত্রিকতার শিকার । যন্ত্র সভ্যতা ক্রমেই আমাদের কৃত্রিম করে তুলেছে । অবিশ্বাস , হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা ক্রমেই ঘিরে ফেলছে আমাদের । ফলে আমাদের জীবনের সৌন্দর্য ও ভালোবাসার স্থান দখল করছে দ্বেষ – হিংসা ও বিলাস বিভ্রম । কেউ কেউ বলছেন , এর মূল কারণ বিজ্ঞানের অভিশাপ যন্ত্র আবিষ্কার ।

উপসংহার :- কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় , এজন্যে বিজ্ঞান বা যন্ত্র দায়ী নয় । দায়ী আমাদের লোভ । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় , “ আমরা আমাদের লোভের জন্য যন্ত্রকে দোষ দিই , মাতলামির জন্যে শাস্তি দিই তালগাছকে । ” মনে হয় , এই লোভ ও বিকৃতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সহজ সুখের ও সরল সৌন্দর্যের দ্বারস্থ হতে হবে । সেই সুখ ও সৌন্দর্য রয়েছে প্রীতি ও ভালবাসার মধ্যে , মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে , পৃথিবীর সকল মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের মধ্যে । জীবনের মাধুর্যকে উপেক্ষা করে , প্রেম ভালবাসাকে বাদ দিয়ে যে শক্তি সাধনা , তা প্রাণহীন ও যান্ত্রিক হতে বাধ্য । শক্তির কাছে যদি প্রাণের মাধুর্য নির্বাসিত হয় ; সম্পদ যদি আনন্দের চেয়ে বেশী মূল্যবান হয় এবং প্রতাপ যদি প্রেমের উপর আধিপত্য বিস্তার করে , তবে যন্ত্র সভ্যতার ব্যর্থতা অবধারিত । 

অতএব , আজকে বিজ্ঞান যদি অভিশাপ হয়ে আমাদের সামনে দেখা দেয় তো সেজন্যে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী দায়ী নয় , দায়ী আমরা । আজ আমরা ভুলতে বসেছি যে , বিজ্ঞানীর ধর্ম নিষ্কাম ধর্ম , বিজ্ঞানের সাধনা সর্ব মানুষের কল্যাণ সাধনা ; বিজ্ঞানের শক্তিকে আজ আমরা যদি সুপথে পরিচালিত করি , মারণাস্ত্র না গড়ে পারমাণবিক শক্তিকে গঠনমূলক কাজে প্রয়োগ করি , তবে পৃথিবীর অশেষ কল্যাণ হতে পারে। শুধুমাত্র নিজেদের প্রয়োগ কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গীর দোষে যে বিজ্ঞানকে অভিশাপ ভেবে আমরা আতঙ্কিত হচ্ছি , অচিরকালের মধ্যে তা আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে ।

Leave a Reply

error: Content is protected !!
Scroll to Top
Scroll to Top
adplus-dvertising