Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান

Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান Question Answer | AHSEC Class 12 Political Science Question Answer in Bengali to each chapter is provided in the list so that you can easily browse throughout different chapters Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান Notes and select needs one.

Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান

Also, you can read the SCERT book online in these sections Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান Solutions by Expert Teachers as per SCERT (CBSE) Book guidelines. These solutions are part of SCERT All Subject Solutions. Here we have given Class 12 Political Science Chapter 2 দ্বি-মেরুকরণের অবসান Solutions for All Subjects, You can practice these here.

দ্বি-মেরুকরণের অবসান

Chapter: 2

প্রথম খন্ড (সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি)

অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১। সোভিয়েত রাশিয়ার উত্থান কখন সংঘটিত হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৯১৭ সালে।

প্রশ্ন ২। বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বি-মেরুকরণের অবসান কখন ঘটে?

উত্তরঃ ১৯৯১ সালে।

প্রশ্ন ৩। মিখাইল গোর্বাচভ কে?

উত্তরঃ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

প্রশ্ন ৪। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী কোন্ রাষ্ট্র হয়েছিল?

উত্তরঃ রাশিয়া।

প্রশ্ন ৫। শুদ্ধ কর:

স্ট্যালিন সোভিয়েত রাশিয়ার সংস্কার আরম্ভ করেছিলেন।

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ সোভিয়েত রাশিয়ার সংস্কার আরম্ভ করেছিলেন।

প্রশ্ন ৬। কোন্ দল সোভিয়েত রাশিয়া শাসন করেছিল?

উত্তরঃ কমিউনিস্ট পার্টি।

প্রশ্ন ৭। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের চূড়ান্ত ও তাৎক্ষণিক কারণ কি ছিল?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি হিসাবে গোর্বাচভ ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে।

প্রশ্ন ৮। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর একমাত্র শক্তিধর দেশ হিসাবে কোন্ রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে?

উত্তরঃ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রশ্ন ৯। CIS-এর সম্পূর্ণ নাম লেখ।

উত্তরঃ Commonwealth of Independent States.

প্রশ্ন ১০। সোভিয়েত ইউনিয়ন কোন্ আদর্শের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল?

উত্তরঃ সাম্যবাদী আদর্শ।

প্রশ্ন ১১। কোন্ বছর ওয়ারশ চুক্তি ভঙ্গ হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৯৮৯ সালে।

প্রশ্ন ১২। কোন্ দেশ ভেঙে পড়াকে ‘দ্বিতীয় বিশ্ব ভেঙে পড়া বলে জানা যায়?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন।

প্রশ্ন ১৩। কোন্ দেশ ভেঙে যাওয়ার পর শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন।

প্রশ্ন ১৪। কোন্ বছর রাশিয়া রাষ্ট্রসংঘে USSR-এর আসনটি হস্তগত করেছিল?

উত্তরঃ ১৯৯২ সালে।

প্রশ্ন ১৫। USSR-এ কতগুলি ইউনিয়ন বা গণরাজ্য ছিল?

উত্তরঃ ১৫টি।

প্রশ্ন ১৬। বলশেভিক কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাপক কে ছিলেন?

উত্তরঃ ভ্লাদিমির লেনিন।

প্রশ্ন ১৭। রাশিয়ার প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?

উত্তরঃ বরিস ইয়েলৎসিন।

প্রশ্ন ১৮। শক থেরাপি কি?

উত্তরঃ স্বৈরতন্ত্রী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে বিশ্ব অধিকোষ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার দ্বারা প্রণীত আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রক্রিয়াকে শক্ থেরাপি বলে।

প্রশ্ন ১৯। সোভিয়েত ইউনিয়ন কখন একটি মহাশক্তি হয়ে উঠেছিল?

উত্তরঃ ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।

প্রশ্ন ২০। USSR-এ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কে আরম্ভ করেছিলেন?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ২১। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব কখন সংঘটিত হয়েছিল?

উত্তরঃ ১৯১৭ সালে।

প্রশ্ন ২২। সোভিয়েত ইউনিয়ন কখন অবলুপ্ত হয়?

উত্তরঃ ১৯৯১ সালে।

প্রশ্ন ২৩। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা কে?

উত্তরঃ লেনিন।

প্রশ্ন ২৪। গোর্বাচভ প্রবর্তিত যে-কোন এক প্রকার সংস্কার প্রক্রিয়ার নাম লেখ।

উত্তরঃ পেরেস্ত্রৈকা।

প্রশ্ন ২৫। পেরেস্ত্রৈকা শব্দের অর্থ কি?

উত্তরঃ পুনর্গঠন।

প্রশ্ন ২৬। ‘স্ট্যালিন’ শব্দের অর্থ কি?

উত্তরঃ লৌহমানব।

প্রশ্ন ২৭। সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির জন্য কে দায়ী?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচত।

প্রশ্ন ২৮। সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট কে ছিলেন?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচত।

প্রশ্ন ২৯। কোন্ সোভিয়েত গণরাজ্য সর্বপ্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে?

উত্তরঃ লিথুয়ানিয়া।

প্রশ্ন ৩০। সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়টি গণরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল?

উত্তরঃ ১৫টি।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১। দ্বিতীয় বিশ্ব বলতে কী বোঝায়?

উত্তরঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের যেসব দেশ সোভিয়েত সামরিক বাহিনী দ্বারা ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল তারা সোভিয়েত গোষ্ঠীতে যোগদান করে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়াসহ আরও কয়েকটি এই গোষ্ঠীভুক্ত দেশকে দ্বিতীয় বিশ্ব বলা হয়।

প্রশ্ন ২। USSR-এ গোর্বাচভ কর্তৃক আরম্ভ করা দুটি সংস্কারের নাম উল্লেখ কর।

উত্তরঃ গোর্বাচভ কর্তৃক আরম্ভ করা সংস্কার দুটি হল–পেরেঞ্জেকা ও গ্লাসনস্ত।

প্রশ্ন ৩। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কে এবং কখন ঘোষণা করেছিলেন?

উত্তরঃ ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর গোর্বাচভ ঘোষণা করেছিলেন।

প্রশ্ন ৪। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সোভিয়েত অর্থনীতির যে-কোন দুটি পার্থক্য উল্লেখ কর।

উত্তরঃ পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সোভিয়েত অর্থনীতির দুটি পার্থক্য নিম্নরূপঃ

(ক) দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল যা পুঁজিবাদী বেসরকারি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে পৃথক ছিল।

(খ) সোভিয়েত রাষ্ট্র সকল শ্রেণীর জনসাধারণের জীবনের মানদণ্ড বজায় রাখা নিশ্চিত করেছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু ও অন্যান্য কল্যাণকামী পরিকল্পনায় বিত্তীয় সাহায্য প্রদান করেছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতি কেবল কতিপয় পুঁজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করে।

প্রশ্ন ৫। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর উদ্ভব হওয়া দুটি রাষ্ট্রের নাম লেখ।

উত্তরঃ সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর উদ্ভব হওয়া দুটি রাষ্ট্র হল—

(ক) আর্মেনিয়া। ও 

(খ) কাজাখিস্থান।

প্রশ্ন ৬। সাম্যবাদী শাসনের অবলুপ্তির পর ত্রাসিক অথবা আতঙ্ক প্রতিকার ব্যবস্থার অর্থ কি?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির পর নব স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহ স্বৈরতন্ত্রী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে বিশ্ব অধিকোষ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার দ্বারা প্রণীত আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রক্রিয়াকে সাম্যবাদী শাসনের অবলুপ্তির পর আতঙ্ক প্রতিকার ব্যবস্থা বলে।

প্রশ্ন ৭। সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার সম্পর্ক কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রগোষ্ঠীসমূহ বিশ্বে এক নূতন ব্যবস্থা সৃষ্টিতে এক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে আরম্ভ করে যাতে কোন একটি দেশ দমনকারীর ভূমিকা পালন করতে না পারে।

প্রশ্ন ৮। সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংস কিভাবে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সমাজবাদী ও পুঁজিবাদী আদর্শের শ্রেষ্ঠতা-প্রতিপন্নকারী সংঘাতের অবসান ঘটে। শীতল যুদ্ধের সমাপ্তিতে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার প্রভাবে পৃথিবীর শান্তি প্রতিষ্ঠার এক নূতন যুগের সূচনা হয়।

প্রশ্ন ৯। ইতিহাসের বৃহত্তম আবর্জনা বিক্রি কি ছিল?

উত্তরঃ শক্ থেরাপির প্রধান ফলশ্রুতি হল রাশিয়া এবং অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ থেকে বৃহৎ শিল্পের বিলুপ্তি। বহু শিল্পের অবমূল্যায়ন করা হয় এবং বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিক্রি করা হয়। এই বিক্রিকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বৃহত্তম আবর্জনা বিক্রি বলেছেন।

প্রশ্ন ১০। কিভাবে একের পর এক কমিউনিস্ট রাজত্বের পতন ঘটেছিল?

উত্তরঃ প্রেসিডেন্ট গোর্বাচভের সংস্কারের ফলে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে। ১৯৯২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চেকো গণরাজ্য ভেঙে যায়। চেকো ও স্লোভক নামে দুটি স্বাধীন গণরাষ্ট্রের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ১৯৯১-৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া গণরাজ্য ভেঙে ক্রোয়েশিয়া, স্লোভানিয়া ও বসনিয়া এই তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়।

প্রশ্ন ১১। আকস্মিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের কারণসমূহ উল্লেখ কর।

উত্তরঃ আকস্মিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের কারণসমূহ নিম্নরূপ:

(ক) সোভিয়েত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলির দুর্বলতা।

(খ) ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল নেতৃত্ব।

(গ) প্রেসিডেন্ট গোর্বাচভের সংস্কার নীতি।

(ঘ) বিভিন্ন গণরাজ্যের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং সাবভৌমত্বের আকাঙ্খা।

প্রশ্ন ১২। সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য লেখ।

উত্তরঃ সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য হল—

(ক) সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ও 

(খ) একদলীয় শাসনব্যবস্থা।

প্রশ্ন ১৩। শক্ থেরাপির যে-কোন দুটি নেতিবাচক প্রভাব লেখ।

উত্তরঃ শক্ থেরাপির দুটি নেতিবাচক প্রভাব নিম্নরূপ:

(ক) এটি রাষ্ট্রসমূহের অর্থনীতি ধ্বংস করে মানুষের বিপর্যয় সাধন করে।

(খ) রাশিয়ান মুদ্রা ‘রুবলের’ দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন ১৪। ‘গ্লাসনস্ত’-এর অর্থ ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ গ্লাসনস্ত-এর অর্থ হল মুক্তনীতি বা উদারনীতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রেসিডেন্ট গোর্বাচভ সোভিয়েত জনগণকে মুক্তভাবে তাদের মত প্রকাশের অধিকার দিয়েছিলেন। ফলে বহু’ সোভিয়েত গণরাজ্য স্বায়ত্বশাসন দাবি করে।

প্রশ্ন ১৫। Near abroad বলতে কি বোঝ?

উত্তরঃ রাশিয়ার অভিমত ছিল যে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ার গণরাজ্যগুলির রাশিয়ার প্রভাবাধীন থাকা উচিত। রাশিয়ার কাছে এই রাষ্ট্রগুলি ছিল ‘নিকট বিদেশ’ বা Near Abroad।

প্রশ্ন ১৬। বৃহৎ খেলা কাকে বলে?

উত্তরঃ মধ্য এশিয়ার শক্তি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাশিয়া, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতাকে বৃহৎ খেলা বলে।

প্রশ্ন ১৭। বার্লিন প্রাচীর কখন ভেঙে ফেলা হয়েছিল?

উত্তরঃ বার্লিন প্রাচীর জার্মানির জনগণ ১৯৮৯ সালে ভেঙে ফেলেছিল। এই ঘটনার ফলস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বের পতন ও শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

প্রশ্ন ১৮। শক থেরাপির রাজনৈতিক পরিণতি নির্ণয় কর।

উত্তরঃ শক্ থেরাপির রাজনৈতিক পরিণতি নিম্নরূপ:

(ক) সোভিয়েত-পরবর্তী রাষ্ট্রসমূহে বিশেষত রাশিয়ার জনসাধারণের মধ্যে বিশাল আর্থিক অসাম্য দেখা দিল, যা অভূতপূর্ব।

(খ) অর্থনৈতিক রূপান্তরের দাবিকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অপেক্ষা অধিক মনোযোগ ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১৯। তিনটি মৌলিক ধারণার উল্লেখ কর যার উপর গোর্বাচভের অর্থনৈতিক কৌশল ভিত্তি করে আছে।

উত্তরঃ গোর্বাচভের নূতন অর্থনৈতিক কৌশল তিনটি ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল—

(ক) উস্কর্মি।

(খ) পেরেস্ত্রৈকা। ও 

(গ) গ্লাসনস্ত।

প্রশ্ন ২০। ভ্লাডিমির লেনিন কে ছিলেন?

উত্তরঃ ভ্লাডিমির লেনিন সোভিয়েত বলশেভিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৭০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের অবিসংবাদি নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মার্ক্সবাদের উপর তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল এবং তিনি কমিউনিস্টদের আশা উদ্দীপনার উৎস ছিলেন।

প্রশ্ন ২১। দ্বি-মেরু শক্তি বলতে কি বোঝ?

উত্তরঃ দ্বি-মেরু শক্তি বলতে সমগ্র বিশ্বকে দুই শক্তি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হওয়া বোঝায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দুই শক্তিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছিল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক গোষ্ঠী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট গোষ্ঠী।

প্রশ্ন ২২। মধ্য এশিয়ার যে-কোন চারটি দেশের নাম লেখ।

উত্তরঃ মধ্য এশিয়ার চারটি দেশ হল – 

(ক) আলবেনিয়া।

(খ) বুলগেরিয়া। 

(গ) কাজাখিস্তান। ও 

(ঘ) তাজিকিস্তান।

প্রশ্ন ২৩। যে-কোন তিনটি বলকান রাষ্ট্রের নাম লেখ।

উত্তরঃ বলকান রাষ্ট্রসমূহকে সাধারণত ‘বলকান উপমহাদেশ’ বলা হয়, কারণ এই রাষ্ট্রসমূহের তিনদিক সমুদ্রবেষ্টিত ছিল। এই রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হারজিগোবিনা, বুলগেরিয়া, মন্টেনিগ্রো, গ্রীস, কর্সিয়া অন্যতম।

প্রশ্ন ২৪। সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির বা খণ্ডিতকরণের দুটি কারণ উল্লেখ কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির বা খণ্ডিতকরণের কারণ দুটি নিম্নরূপ:

(ক) ত্রুটিপূর্ণ নেতৃত্ব—দেশের ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির জন্য বহুলাংশে দায়ী।

(খ) গোর্বাচভের উদার নীতি—গোর্বাচভের উদার নীতি অবলম্বনের ফলে সোভিয়েত বিরোধী শক্তি সাহসী হয় এবং তারা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে।

প্রশ্ন ২৫। জোসেফ স্ট্যালিন কে ছিলেন?

উত্তরঃ জোসেফ স্ট্যালিন ছিলেন লেনিনের উত্তরাধিকারি। তিনি ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে শিল্প ও কৃষির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। স্ট্যালিন ছিলেন লৌহমানব এবং তাঁর নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে। তিনি স্বৈরতান্ত্রিকভাবে দেশ শাসন করেছিলেন।

দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থা সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

উত্তরঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত সংঘ প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সোভিয়েত অর্থনীতি সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত, বিশ্বের বাকি দেশগুলি থেকে উন্নত ছিল। তেল, লোহা ও ইস্পাতের বিশাল শক্তিভাণ্ডার, যন্ত্রপাতি উৎপাদন শিল্প ও পরিবহণ ব্যবস্থা দেশে সুদূর ও দুর্গম অঞ্চলসমহূকে যুক্ত রেখেছিল। এর একটি স্বদেশীয় উপভোক্তা শিল্প ছিল যেখানে আলপিন থেকে আরম্ভ করে গাড়ি পর্যন্ত সবই উৎপাদন করা হত। সোভিয়েত রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জীবনযাত্রার নূন্যতম মান স্থির করে দেয়। নিতান্ত প্রয়োজনীয় কল্যাণকামী যোজনাসমূহ; যেমন—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা ইত্যাদি সরকারের আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকত। মালিকানা স্বত্ত্বের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হত।

কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার ক্ষেত্রে বলশেভিক দলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। অন্য কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি প্রদান করা ছিল না। বলশেভিক নিয়ন্ত্রণকে ‘সোভিয়েত ব্যবস্থা’ বলে জানা যায়। এই ব্যবস্থা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কার্যকরী করা হয়েছিল।

প্রশ্ন ২। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণ সোভিয়েত ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিল না কেন? চারটি কারণ দর্শাও।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণ সোভিয়েত ব্যবস্থায় নিম্নলিখিত কারণে সন্তুষ্ট ছিল না:

(ক) সোভিয়েত ব্যবস্থা একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিকে স্বীকার করে। কমিউনিস্ট পার্টিকে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের প্রহরী রূপে গণ্য করা হয়। সোভিয়েত ব্যবস্থায় অন্য রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বেআইনি। এই নীতি ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।

(খ) সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের শত্রুকে কঠোর হস্তে দমন করা হত। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল।

(গ) সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক অধিকার অপেক্ষা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারের উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হত। জনগণের বাক্-স্বাধীনতা সীমিত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে বিবেচনা করা হত এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি দেওয়া হত।

(ঘ) সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পূর্ণ কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।

প্রশ্ন ৩। সোভিয়েত বিভাজনের ফলাফল অতি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

অথবা,

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তরঃ বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের যেসব প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নে বিবৃত হল:

(ক) বিরোধের পরিসমাপ্তি: সমাজবাদী ব্যবস্থা না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য এই বিবাদের সমাপ্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিসমাপ্তি ঘটে। 

(খ) ক্ষমতার সম্পর্কের পরিবর্তন: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আমেরিকাকে বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তিধর দেশ হিসাবে পরিগণিত করে। আমেরিকাকে প্রত্যাখ্যান জানানোর কোন রাষ্ট্র বর্তমানে নেই।

(গ) নূতন দেশসমূহের উত্থান: সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙনের ফলে সৃষ্টি হওয়া দেশসমূহের নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ আছে; বাল্টিক গণরাজ্যসমূহে অর্থাৎ ইস্টোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পূর্ব ইউরোপের গণরাজ্যসমূহ ইউরোপীয় সংঘে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গে ন্যাটোর (NATO) সদস্যভুক্ত হতে চায়। সেইজন্য এই রাষ্ট্রসমূহ একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে এবং অন্যদিকে পশ্চিমী দেশের সঙ্গে, আমেরিকা ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়।

প্রশ্ন ৪। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজন থেকে সৃষ্ট হওয়া নূতন রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন হওয়ার পর অনেক নূতন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এই রাষ্ট্রসমূহের নিজ স্বাধীন আশা ও আকাঙ্খা আছে। এর মধ্যে কতিপয় দেশ বিশেষত বাল্টিক ও পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ ‘ইউরোপীয় সংঘে’ থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং ন্যাটোর (NATO) সদস্যভুক্ত হয়। মধ্য এশিয়ার দেশসমূহ নিজ ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা গ্রহণ করে রাশিয়ার সঙ্গে সম্বন্ধ রক্ষা ছাড়াও পশ্চিমী দেশ, চীন ও আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করার পক্ষপাতী। এইভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে বহু নূতন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে যার নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে।

প্রশ্ন ৫। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় আছে বলে তুমি মনে কর কি? চারটি কারণ দর্শাও।

উত্তরঃ সোভিয়েত সংঘের অবলুপ্তির পরপরই ভারত-রুশ সম্পর্ক সাময়িক শুষ্কতা প্রাপ্ত হলেও পুনরায় পূর্বের ন্যায় ঘনিষ্ঠ হয়। রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক ভারতের বিদেশনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস ও যৌথ আগ্রহের উপর সুগভীরভাবে স্থাপিত।

রাশিয়া ও ভারত একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টির অংশীদার। এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা বহু- মেরুবিশিষ্ট বিশ্বব্যবস্থা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আঙিনায় বহু শক্তিকেন্দ্রের সহাবস্থানকে বোঝায়। ২০০১ সালের যুদ্ধ-বিষয়ক সুপরিকল্পিত অবস্থানগত চুক্তির অঙ্গ হিসাবে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ৮০টিরও বেশি দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়। অধুনা ২০১৬ সালে ভারত তার সীমান্ত সুরক্ষা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে রাশিয়ার থেকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সীমা সুরক্ষা সংক্রান্ত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করে।

রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে বহু বিতর্কিত বিষয়ে; যেমন— কাশ্মীর, ঊর্জা সরবরাহ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের তথ্যাবলীর অংশীদার হওয়া, মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার এবং চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা ইত্যাদিতে ভারত সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাছাড়াও দুইটি দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি এবং অবৈধ চোরাকারবার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অনেকগুলি চুক্তি সম্পাদন করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, সোভিয়েত সংঘের অবলুপ্তির পর ভারত-রুশ সম্পর্কের সাময়িক এবং কিঞ্চিৎ অবনতি ঘটলেও বর্তমানে দুইটি দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

প্রশ্ন ৬। ১৯১৭ সালের রাশিয়ার বিপ্লবের তাৎপর্য কি?

উত্তরঃ ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের সূচনা হয়। এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন মহামতি লেনিন। এই বিপ্লব ইতিহাসের পাতায় এক উল্লেখযোগ্য বিপ্লব হিসাবে পরিগণিত হয়। এই বিপ্লবের ফলেই সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। শোষণহীন ও সমতাপূর্ণ রাশিয়া গঠনের উদ্দেশ্যে বলশেভিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। লেনিনের যোগ্য সহযোগী ছিলেন স্ট্যালিন। তাঁরা উভয়েই মার্কসবাদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং কমিউনিস্টদের আশা উদ্দীপনার উৎস ছিলেন। তাঁরা একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন যা পশ্চিমী দুনিয়ার প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার থেকে একদম পৃথক ছিল এবং রাষ্ট্রের দ্বারা পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার ক্ষেত্রে বলশেভিক দলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। অন্য কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হত না। বলশেভিক পার্টির নিয়ন্ত্রণকে সোভিয়েত ব্যবস্থা বলে জানা যায়। এই ব্যবস্থা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কার্যকরী করা হয়েছিল।

প্রশ্ন ৭। গোর্বাচভের সংস্কার নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর।

উত্তরঃ গোর্বাচভের সংস্কার নীতির দুইটি প্রধান প্রক্রিয়া—গ্লাসনস্ত বা মুক্তনীতি বা উদারনীতি এবং পেরেস্ত্রৈকা বা পুনর্গঠন। গোর্বাচভের সংস্কার নীতি অনেক সমস্যার সমাধান করবে বলে আশা করা হয়েছিল। গোর্বাচভ অর্থনীতির সংস্কার সাধন করে পশ্চিমী দেশগুলির সমান্তরালে সোভিয়েত সংঘকে নিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও কিছুটা শিথিল করার প্রয়াস নিয়েছিলেন। সোভিয়েত সমাজের একটি অংশ মনে করেন যে গোর্বাচভের আরও দ্রুতগতিতে কাজ করা উচিত ছিল। গোর্বাচভের কাজের প্রণালী এদের হতাশ ও অস্থির করে তোলে। অপরদিকে, কমিউনিস্ট শাসনে লাভবান একটি অংশ মনে করেন যে গোর্বাচভ অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছেন। ফলতঃ এই বিরুদ্ধ মতের দড়ি টানাটানির খেলায় গোর্বাচভ কোন পক্ষকেই খুশি করতে পারলেন না এবং জনমতও বিভক্ত হয়ে গেল।

প্রশ্ন ৮। শক থেরাপির পরিণতির ক্ষেত্রসমূহের বিশদ তালিকা দাও।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পিছনে নতুন করে স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রসমূহের স্বেচ্ছাচারী সাম্যবাদী অবস্থার অবসান এবং পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তনের ফলে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এহেন পরিস্থিতিতে রাশিয়া আর মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে সুবিধা দেবার জন্য বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাকে বলে আঘাত নিরাময়। 

এই আঘাত নিরাময়ের ফলাফল নিম্নরূপঃ

(ক) রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যক্তিদের নিকট বিক্রয় করা হয়।

(খ) রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটে।

(গ) যৌথ খামার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।

(ঘ) পুরাতন সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।

(ঙ) কালোবাজারি এবং মজুতদারির রমরমা প্রকট হয়।

(চ) সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থা বন্ধের ফলে বিশালসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।

(ছ) দ্রব্যমূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পায় ও মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।

প্রশ্ন ৯। কি কি কারণ গোর্বাচভকে বাধ্য করেছিল সোভিয়েত রাশিয়ায় সংস্কার প্রবর্তনে?

উত্তরঃ নিম্নোক্ত কারণে গোর্বাচভ সোভিয়েত রাশিয়ায় সংস্কারে বাধ্য হয়েছিলেন:

(ক) তথ্য-প্রযুক্তিতে উন্নত পশ্চিমী দেশসমূহের তুলনায় সোভিয়েত রাশিয়া যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছিল। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে সোভিয়েত রাশিয়া পরিবর্তনও চাইছিল।

(খ) সোভিয়েত রাশিয়া নিজেদের বাৎসরিক বাজেটের বেশি অংশ পরমাণু শক্তি বৃদ্ধি ও সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের জন্য ব্যবহার করার ফলে অর্থব্যবস্থার উপর বোঝা চাপছিল।

(গ) ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া কর্তৃক আফগানিস্তান আক্রমণের ফলে সোভিয়েত রাশিয়া যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছিল। ফলে ভোগ্যবস্তুর তুলনায় খাদ্যবস্তুর আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়ার কোন প্রকার অগ্রগতি হচ্ছিল না।

প্রশ্ন ১০। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে ভারত এবং সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে সাদৃশ্যের তালিকা দাও।

উত্তরঃ ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শের মধ্যে যথেষ্ট মিল বা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। দুই দেশের গণতান্ত্রিক আদর্শ ও নীতিকে গুরুত্ব প্রদান করা হয় আর দুই দেশেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জে কাশ্মীর বিতর্কে ভারতের অবস্থানকে সোভিয়েত রাশিয়া সমর্থন করে। বিদেশী আক্রমণে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে, সোভিয়েত রাশিয়া ভারতকে সমর্থন করে। ভারতও প্রচ্ছন্নভাবে সোভিয়েত বিদেশ নীতিকে সঙ্গীন মুহূর্তে সমর্থন করে। সোভিয়েত রাশিয়া ভারতের সরকারি ক্ষেত্রে ইস্পাত ও ভারী শিল্পে আর্থিক ও কারিগরী সহযোগিতা প্রদান করে, এমনকি ভারতের বিদেশী মুদ্রায় ঘাটতি থাকায় ভারতীয় মুদ্রা পর্যন্ত গ্রহণ করে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও আদান-প্রদান ঘটে।

প্রশ্ন ১১। সোভিয়েত ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি টীকা লেখ।

উত্তরঃ ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নে এক নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে যা সোভিয়েত পদ্ধতি নামে পরিচিত। 

সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হল—

(ক) রাষ্ট্রের প্রাধান্য।

(খ) কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

(গ) রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। এবং 

(ঘ) একদলীয় শাসনব্যবস্থা। সোভিয়েত ব্যবস্থায় কোন বিরোধীদলের স্থান ছিল না।

প্রশ্ন ১২। গোর্বাচভের সংস্কার নীতি ব্যর্থ হল কেন?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত সংঘের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন এবং সোভিয়েত ব্যবস্থার সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমের সমতুল্য উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে তিনি ‘পেরেস্ত্রৈকা’ (পুনর্নির্মাণ) এবং ‘গ্লাসনস্ত’ (মুক্তনীতি) নামক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সংস্কার নীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

গোর্বাচভ তাঁর সংস্কার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার শিথিলতার মাধ্যমে এমন কিছু শক্তি ও প্রত্যাশাকে গতি দিলেন যা খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তিই আগাম বলতে পেরেছিলেন এবং যা নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

সোভিয়েত সমাজের এক অংশ মনে করেন যে গোর্বাচভের আরও দ্রুতগতিতে কাজ করা উচিৎ ছিল। অপরদিকে বিশেষত কমিউনিস্ট দলের সদস্যরা মনে করলেন যে গোর্বাচভ অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছেন। এই ‘দড়ি টানাটানির খেলায়’ গোর্বাচভ সকল পক্ষের সমর্থন হারালেন শুধু নয়, জনমতও বিভক্ত হয়ে গেল।

তাছাড়া মুক্তনীতি গ্রহণের ফলে বিভিন্ন গণরাজ্যসমূহে জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমতার আকাঙ্খা জন্ম নেয় এবং সোভিয়েত সংঘের আধিপত্য অস্বীকার করে।

গোর্বাচভ সোভিয়েত রাশিয়ার সমস্যাগুলির কারণসমূহ নির্ভুলভাবে সনাক্ত করে সংস্কারের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও উপরে উল্লিখিত কারণগুলির জন্য সোভিয়েত সংঘের পতন ঘটে।

প্রশ্ন ১৩। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভারত গণসাম্যবাদ-পরবর্তী দেশসমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অতি নিগূঢ়। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বিদেশ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই সম্পর্ক, যা পারস্পরিক বিশ্বাস ও যৌথ আগ্রহের উপর সুগভীরভাবে স্থাপিত। ভারত ও রাশিয়া উভয় দেশ আন্তর্জাতিক আঙিনায় বহু শক্তি- কেন্দ্রের সহাবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানায়। রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে বহু আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভারত সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। ভারত সবসময়ই রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নতমানের সামরিক উপকরণ পেয়ে থাকে।

যেহেতু ভারত একটি তেল আমদানীকারক দেশ সেহেতু রাশিয়া ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া তেল সংকটে বারংবার ভারতকে সহায়তা করেছে। ভারতের বিদেশী মুদ্রার সংকটকালে রাশিয়া বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় মুদ্রা পর্যন্ত গ্রহণ করে।

তাছাড়া ভারত এখন রাশিয়া, কাজাখিস্থান ও তুর্কমেনিস্তান গণরাজ্য থেকে উচ্চা আমদানির পরিমাণ বাড়াবার চেষ্টা করছে। এই গণরাজ্যসমূহের সাথে সহযোগিতা বলতে তৈলক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব বোঝায়। পরমাণুশক্তি-সংক্রান্ত প্রকল্প, মহাকাশ প্রকল্প ও বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পে রাশিয়া ভারতকে সহযোগিতা করে।

প্রশ্ন ১৪। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি কিভাবে অনেক নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাবে সহায়তা করে?

উত্তরঃ গোর্বাচভের সংস্কার নীতির ফলে সোভিয়েত গণরাজ্যসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে। ১৯৮৮ সালে লিথুয়ানিয়ার মুক্তি আন্দোলন শুরু হয় এবং এস্টোনিয়া ও ল্যাটভিয়াতে তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালের ১৫ই মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি গণরাজ্যের অন্যতম লিথুয়ানিয়া সর্বপ্রথম নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। ১৯৯০ সালের জুন মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তার স্বতন্ত্রতা ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ স্বাধীন গণরাজ্যসমূহকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রমণ্ডল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, মলডোভা, কাজাখিস্তান, তাজিকিস্থান, তুর্কমেনিস্থান এবং উজবেকিস্থান তাতে যোগদান করে। ১৯৯৩ সালে জর্জিয়া এতে যোগদান করে।

প্রশ্ন ১৫। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃতি আলোচনা কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত সংঘের অবলুপ্তির পরপরই ভারত-রুশ সম্পর্ক সাময়িক শুষ্কতা প্রাপ্ত হলেও পুনরায় পূর্বের ন্যায় ঘনিষ্ঠ হয়। রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক ভারতের বিদেশনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস ও যৌথ আগ্রহের উপর সুগভীরভাবে স্থাপিত।

রাশিয়া ও ভারত একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টির অংশীদার। এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা বহু- মেরুবিশিষ্ট বিশ্বব্যবস্থা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আঙিনায় বহু শক্তিকেন্দ্রের সহাবস্থানকে বোঝায়। ২০০১ সালের যুদ্ধ-বিষয়ক সুপরিকল্পিত অবস্থানগত চুক্তির অঙ্গ হিসাবে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ৮০টিরও বেশি দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়। অধুনা ২০১৬ সালে ভারত তার সীমান্ত সুরক্ষা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে রাশিয়ার থেকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সীমা সুরক্ষা সংক্রান্ত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করে।

রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে বহু বিতর্কিত বিষয়ে; যেমন— কাশ্মীর, ঊর্জা সরবরাহ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের তথ্যাবলীর অংশীদার হওয়া, মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার এবং চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা ইত্যাদিতে ভারত সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাছাড়াও দুইটি দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি এবং অবৈধ চোরাকারবার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অনেকগুলি চুক্তি সম্পাদন করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, সোভিয়েত সংঘের অবলুপ্তির পর ভারত-রুশ সম্পর্কের সাময়িক এবং কিঞ্চিৎ অবনতি ঘটলেও বর্তমানে দুইটি দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১৬। ‘দ্বি-মেরু শক্তি’ শব্দটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হল অধিকাংশ বৃহৎ শক্তির ক্ষমতা হ্রাস। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নই দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। সুতরাং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে এক নূতন শক্তি কাঠামোর আবির্ভাব ঘটে। এই ব্যবস্থায় নূতন দুইটি মহাশক্তিধর রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব নেতৃত্বে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য কায়েম করতে আরম্ভ করে। সমগ্র বিশ্ব দুইটি শক্তিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমী গোষ্ঠী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগোষ্ঠী বা প্রাচ্যগোষ্ঠী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর বহু বছর এই দুই শক্তিগোষ্ঠী বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিশ্বকে এই দুই ক্ষমতা গোষ্ঠীতে বিভক্ত করাকেই দ্বিমেরু শক্তি গোষ্ঠী বা bipolarity বলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পর শীতল যুদ্ধের অবসানে দ্বি-মেরু শক্তির অবসান ঘটে।

প্রশ্ন ১৭। সোভিয়েত অর্থব্যবস্থার চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত অর্থব্যবস্থা পশ্চিমী অর্থব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। এর বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

(ক) সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিকল্পিত অর্থব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। দেশের অর্থব্যবস্থা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হত।

(খ) সোভিয়েত ইউনিয়নে সকল প্রকার অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত ছিল।

(গ) সোভিয়েত ইউনিয়নে কোন বেসরকারি অর্থব্যবস্থা ছিল না। উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হত।

(ঘ) সোভিয়েত নাগরিকদের কাজের অধিক উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার এবং বিশ্রামের অধিকার ছিল।

প্রশ্ন ১৮। শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

উত্তরঃ শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাছাড়া নিম্নোক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিস্তৃত ছিলঃ

(ক) অর্থনৈতিক: সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সংকট সময়ে সরকারি কোম্পানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করে। বোকারো, ভিলাই এবং বিশাখাপত্তনম্ প্রভৃতি ইস্পাত শিল্পে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতবর্ষকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ভারতের বৈদেশিক বিনিময়ে ঘাটতি দেখা দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় মুদ্রা গ্রহণ করে।

(খ) রাজনৈতিক: সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রসংঘে কাশ্মীরে ভারতের অবস্থান সমর্থন করে। ১৯৭১ সালে ভারত-পাক যুদ্ধে ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে সমর্থন জানায়।

(গ) সামরিক: ভারতবর্ষ অধিকাংশ সামরিক ক্রিয়া-কৌশলই সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে অর্জন করে। উভয় দেশই যৌথভাবে সামরিক সাজসরঞ্জাম তৈরির জন্য নানা প্রকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

(ঘ) সাংস্কৃতিক: হিন্দি ছায়াছবি এবং রাজকাপুর ও অমিতাভ বচ্চনের মতো অভিনেতা সোভিয়েত ইউনিয়নে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বহুসংখ্যক ভারতীয় লেখক ও শিল্পী এই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিদর্শন করেন।

প্রশ্ন ১৯। সোভিয়েত অর্থনীতির উন্নতিকল্পে গোর্বাচভ কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন?

উত্তরঃ ১৯৮৫ সালে গোর্বাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সময়ে সোভিয়েত অর্থব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। 

দেশের অর্থব্যবস্থা শক্তিশালী করতে গোর্বাচভ নিম্নলিখিত পদক্ষেপ অবলম্বন করেছিলেন:

(ক) দেশের অর্থব্যবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়।

(খ) ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদান করা হয় এবং তারা বেসরকারি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়।

(গ) রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা রচনাকারীদের কার্যকালের সমাপ্তি ঘটানো হয়।

(ঘ) পণ্যসামগ্রীর গুণগত মান উন্নয়নের জন্য উৎপাদন ব্যবস্থায় গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

(ঙ) অর্থব্যবস্থার উন্নতিকল্পে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রবর্তন করা হয়।

প্রশ্ন ২০। শক্ থেরাপির বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির পর নব স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহ স্বৈরতন্ত্রী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে বিশ্ব অধিকোষ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার দ্বারা প্রণীত আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রক্রিয়াকে শক্ থেরাপি (shock therapy) বলে। 

এই প্রক্রিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

(ক) প্রতিটি তদানীন্তন কমিউনিস্ট দেশকে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা পরিবর্তন করে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।

(খ) প্রতিটি রাষ্ট্রই ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের অধিকার হিসাবে গ্রহণ করে।

(গ) প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বেসরকারিকরণ ও যৌথ মালিকানা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল।

(ঘ) সমবায় খামার ব্যবস্থার পরিবর্তনে সরকারি খামার ব্যবস্থা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

(ঙ) প্রত্যেক রাষ্ট্রই মুক্ত বাণিজ্য ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা অনুসরণ করবে।

প্রশ্ন ২১। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক সম্পর্ক সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তরঃ শীতল যুদ্ধের সময় ভারত ও সোভিয়েত সংঘের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক ছিল, যার ফলে বহু সমালোচক ভারতকে সোভিয়েত জোটের অংশ মনে করত। এটি একটি বহুমাত্রিক সম্পর্ক ছিল।

সোভিয়েত সংঘ ভারতের রাষ্ট্র-পরিচালিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আর্থিক ও কারিগরী সাহায্য প্রদান করে। ভারতে বিদেশী মুদ্রার সংকট কালে বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় মুদ্রা গ্রহণ করে।

রাষ্ট্রপুঞ্জে কাশ্মীর বিতর্কে ভারতের অবস্থানকে এবং ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধকে সোভিয়েত সংঘ সমর্থন করে।

সামরিক ক্ষেত্রে ভারত সোভিয়েত সংঘের সহায়তা পেয়েছিল এবং উভয় দেশ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

তবে সোভিয়েত, সংঘের পতনের পর ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ কাশ্মীর বিতর্কে ভারতকে সমর্থন জানানো বন্ধ করে দেন। সামরিক সহায়তাও কমিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে রুশ রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিনের ভারত সফর কালে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও এই চুক্তি ১৯৭১ সালের চুক্তির ন্যায় সামরিক ক্ষেত্রে ভারতের জন্য লাভদায়ক হয়নি। ১৯৯৮ সালে পোখরান পরমাণু পরীক্ষাকে রাশিয়া আমেরিকার ন্যায় নিন্দা করে।

২০০০ সালে পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। সামরিক ক্ষেত্রে ভারত পুনরায় রাশিয়ার কাছ থেকে বেশি করে সাহায্য পেতে লাগল। উভয় দেশের মধ্যে ২০০১ সালে ৮০টিরও বেশি দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০০৭ সালে পুতিন ভারত সফরে আসেন এবং এই সফরকালে রাশিয়া তামিলনাড়ুর কুড়ানকুলাম পরমাণু কেন্দ্রে অতিরিক্ত চারটি পাওয়ার ইউনিট তৈরি করতে সম্মত হয়।

তাছাড়াও দুইটি দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি এবং অবৈধ চোরা কারবার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অনেকগুলি চুক্তি সম্পাদন করে।

অধুনা ২০১৬ সালে ভারত তার সীমান্ত সুরক্ষা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে রাশিয়ার থেকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সীমা সুরক্ষা সংক্রান্ত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করে।

অতি-দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ১। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজন কেন হয়েছিল?

অথবা,

সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন ভেঙে গিয়েছিল তার তিনটি কারণ আলোচনা কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯১৭ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর আত্মপ্রকাশ করে। এতে মোট ১৫টি গণরাজ্যের একটি যুক্তরাষ্ট্র ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ঘটে এবং ১৫টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির জন্য নিম্নোক্ত কারণসমূহ বহুলাংশে দায়ী:

(ক) সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল সোভিয়েত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসমূহের দুর্বলতা যা সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পরিপূর্ণ করতে পারেনি। বহু বছরের আর্থিক স্থবিরতার ফলে দেশে ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। জনগণের এক বিরাট অংশের মধ্যে সোভিয়েত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দেয়। সাধারণ নাগরিকগণ পশ্চিমী দেশসমূহের উন্নতি লক্ষ্য করে অনুপ্রাণিত হয়। এইভাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের মোহভঙ্গ হয়।

(খ) সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির আরেকটি প্রধান কারণ হ’ল- ত্রুটিপূর্ণ নেতৃত্ব। সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাই ছিলেন সরকারের প্রধান। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম বছরগুলিতে লেনিন, স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ প্রভৃতি নেতাগণ জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁহাদের কার্যপ্রণালীর দ্বারা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতেন, কিন্তু পরবর্তীকালে নেতাগণ তাদের বিলাসবহুল জীবন, স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির জন্য মানুষের শ্রদ্ধা ও সমর্থন হারান। এর কলে সোভিয়েত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে ও ধীরে ধীরে অবলুপ্তির দিকে অগ্রসর হয়।

(গ) প্রেসিডেন্ট গোর্বাচভের সংস্কার নীতিও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু স্বাধীনতা, সমতা, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং একতার পরিবেশ তৈরি না করে তিনি গ্লাসনস্ত (Glasnost) ও পেরেস্ত্রৈকা (Perestroika) নামক দুইটি সংস্কার কর্মসূচী বাস্তবায়িত করতে আরম্ভ করেন। ‘গ্লাসনস্ত’-এর অর্থ ‘মুক্ত বা অবাধ নীতি’ এবং ‘পেরেস্ত্রৈকা’র অর্থ হল ‘পুনর্গঠন’। এই নীতির দ্বারা জনগণকে অত্যাধিক স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। ফলে বিভিন্ন গণরাজ্য অধিক পরিমাণে স্বশাসনের দাবি উত্থাপন করে।

(ঘ) বিভিন্ন গণরাজ্যের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির অন্য একটি প্রধান কারণ। বাল্টিক রিপাব্লিকের তিনটি গণরাজ্য লাটভিয়া, এস্টোনিয়া এবং লিথুয়ানিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শীঘ্রই অন্যান্য গণরাজ্য তা অনুসরণ করে। আভ্যন্তরীণ নীতির দরুন গোর্বাচভ তা রোধ করতে পারেন নি। অতঃপর গণরাজ্যগুলি একে একে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর গোর্বাচভ পদত্যাগ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে ১৫টি স্বাধীন গণরাজ্য পরিণত করে।

প্রশ্ন ২। কি কি পরিস্থিতি গোর্বাচভকে সোভিয়েত রাশিয়ার সংস্কার সাধন করতে বাধ্য করেছিল?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি হন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করেন। 

নিম্নোক্ত উপাদানসমূহ তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সংস্কার প্রবর্তনে বাধ্য করেছিল:

(ক) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে নিজের অবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পারমাণবিক ও সামরিক দিক দিয়ে অত্যধিক ব্যয় করতে হয়। কিন্তু সোভিয়েত অর্থনীতি তেমন শক্তিশালী ছিল না।

(খ) সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোগত দিক দিয়ে পশ্চিমী দেশ থেকে অনেক পিছনে পড়েছিল।

(গ) সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত আমলাতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ছিল এবং জনগণ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিল না। বাক্‌স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত থাকায় জনগণ হতাশ হয়ে পড়ে।

(ঘ) কমিউনিস্ট পার্টি সমগ্র শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করত এবং তা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না। দেশে বিরোধী দল ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছিল না।

(ঙ) সোভিয়েত ইউনিয়ন জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারেনি।

(চ) আফগানিস্থানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল করেছিল।

প্রশ্ন ৩। শক্ থেরাপি কি? সাম্যবাদোত্তরকালে শক থেরাপির পরিণাম কি হয়েছিল? সাম্যবাদী ব্যবস্থা থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটা সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা ছিল কি?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিতে সাম্যবাদও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। সাম্যবাদের অবসানের পর এই রাষ্ট্রগুলিতে স্বৈরতন্ত্রী সমাজবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে শক্ থেরাপি (shock therapy) বলা হয়। এই রাষ্ট্রসমূহের প্রত্যেকটিতেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বেসরকারি মালিকানা প্রধান বিষয় ছিল। যৌথ খামার ব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি খামার ও মালিকানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

শক্ থেরাপির ফলাফল বা পরিণাম: শক্ থেরাপি ১৯৯০-এর দশকে প্রয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু তা অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে পারে নি। তা রাষ্ট্রসমূহের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিপর্যয় সাধন করে। রাশিয়ায় সরকার-নিয়ন্ত্রিত বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যক্তিদের নিকট বিক্রি করা হয়।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ান মুদ্রা ‘রুবলের’ দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতির হার এত উঁচু হয় যে জনসাধারণ তাদের সঞ্চয় হারান। যৌথ খামারব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ফলে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। রাশিয়া বিদেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি আরম্ভ করে। পুরাতন ব্যবসা পদ্ধতি ভেঙে পড়ে যার কোন বিকল্প থাকে না।

পুরাতন সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। সরকারি ভরতুকি প্রথা বন্ধের ফলে বিশালসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।

স্বৈরতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করার জন্য শক্ থেরাপি প্রধান উপায় ছিল না। তা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারেনি। নব-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রগুলির রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিবর্তনের প্রচেষ্টা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির গতি রুদ্ধ করে দেয়। উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে। ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। কালোবাজারি ও মজুতদারি এই অবস্থায় পূর্ণ সুযোগ লাভ করে। দ্রব্যমূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। স্বাধীন রাষ্ট্রমণ্ডলীর প্রায় সকল দেশই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের শিকার হয়। রাজনৈতিকভাবেও জনগণ লাভবান হয়নি। রাষ্ট্রমণ্ডলীর বিভিন্ন রাষ্ট্র তাড়াহুড়ো করে বিভিন্ন প্রকার সংবিধান তৈরি করে এবং বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবলম্বন করে। কিন্তু এতে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয় নি। সুতরাং এটা বলা যায় যে, শক্ থেরাপি প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের একমাত্র অবলম্বন ছিল না।

প্রশ্ন ৪। মনে কর সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ঘটে নি এবং সমগ্র বিশ্ব ১৯৮০ দশকের মতো দ্বি-মেরুকৃত। তাহলে বিগত দুই দশকের বিশ্ব ঘটনাবলী কিভাবে প্রভাবিত করত? এমন তিনটি বিষয় বা ঘটনা চিহ্নিত কর যা ঐরূপ বিশ্বে ঘটত না।

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি না ঘটলে বিগত দুই দশকে বিশ্বে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি ঘটত:

(ক) দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত এবং শীতল যুদ্ধ বা ঠান্ডা লড়াই এখনও অব্যাহত থাকত।

(খ) বিশ্ব রাজনীতিতে বিবাদ, বিরোধ ও সংঘাত অব্যাহত থাকত।

(গ) বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন প্রাধান্য তীব্র হত না।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি না ঘটলে বিশ্বে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি ঘটত নাঃ

(ক) সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলি এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত না।

(খ) সোভিয়েত অর্থনীতির অসারত্ব প্রকাশিত হত না।

(গ) সাম্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের জনগণ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের উন্নয়নের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকত।

প্রশ্ন ৫। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরেও ভারত আর রাশিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় আছে। ভারত আর রাশিয়ার সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস ও উৎকৃষ্ট নীতি ও আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-রাশিয়ার কৌশলগত চুক্তির অংশ হিসাবে ভারত ও রাশিয়া ৮০টিরও অধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ভারতের সামরিক, বিমান ও নৌ বাহিনীর বেশিরভাগ অস্ত্রশস্ত্র ও প্রতিরক্ষার সামগ্রী রাশিয়া সরবরাহ করে। খনিজ তেল আমদানি করা দেশ হিসাবে ভারতবর্ষের তৈল সঙ্কটের সময় রাশিয়া সহায়তার হাত বাড়ায়। ২০০৪ সালে রুশপ্রধান ভ্লাডিমির পুতিন ভারত সফরে এলে উভয় দেশই প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে। ২০০৭ সালে ভ্লাডিমির পুতিনের পুনরায় ভারত সফর ঘটে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি রূপে।

এছাড়াও দুই দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি ও অবৈধ চোরাকারবার প্রতিরোধে অনেকগুলি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সাংস্কৃতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা সম্পর্ক উন্নয়নে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জে দুই দেশের সমমনোভাব ও অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে গভীর রেখাপাত করেছে।

প্রশ্ন ৬। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রর অর্থনীতির সঙ্গে সোভিয়েত অর্থনীতির পৃথক করা বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।

উত্তরঃ পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সোভিয়েত অর্থনীতি পৃথকীকরণের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপঃ

(ক) সোভিয়েত রাশিয়ার অর্থনীতি সমাজবাদী অর্থনীতির উপর ভর করে গড়ে উঠেছিল; অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর ভর করে গড়ে উঠেছিল।

(খ) সোভিয়েত রাশিয়ার অর্থনীতি সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের থাকে; তাতে কোন প্রকার ব্যক্তি মালিকানার অবকাশ বা অনুমতি নেই। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মালিকানা বৈধ এবং ব্যক্তিবিশেষের তা হস্তান্তরের অধিকার স্বীকৃত।

(গ) সোভিয়েত রাশিয়ায় চাষবাস রাষ্ট্রই নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু আমেরিকায় চাষবাস ব্যক্তি মালিকানায় সংঘটিত হয়, সরকার কোন রকম হস্তক্ষেপ করে না।

(ঘ) সোভিয়েত রাশিয়ায় সবরকম শিল্প সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে। অপরদিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প ও বাণিজ্য ব্যক্তি মালিকানায় নিয়ন্ত্রিত হয়। আমদানি-রপ্তানিতেও সরকার অযথা নিয়ন্ত্রণ বলবৎ করে না।

প্রশ্ন ৭। সোভিয়েত ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ উল্লেখ কর।

উত্তরঃ ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে সোভিয়েত সংঘের জন্ম হয়—বিস্তারিতভাবে একে ইউনিয়ন অফ্ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্‌স্ বলা হয়; অর্থাৎ রুশদেশে প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ও কৃষকদের প্রতিনিধি সভার আদর্শে সম্মিলিত সমাজতন্ত্রী গণরাজ্যসমূহ। মূলত যে আদর্শগুলির দ্বারা এই বিপ্লব অনুপ্রাণিত হয় সেগুলি হল— 

(ক) সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। এবং 

(খ) এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার ও সুযোগ থাকবে।

সোভিয়েত সংঘ গঠনের পর সেখানকার জনগণ অবশ্যই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল উপভোগ করছিল, তবে একটা সময় এই ব্যবস্থার উপর মানুষ আস্থা হারাতে লাগল। 

নিচে সোভিয়েত ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ উল্লেখ করা হল যেগুলি সোভিয়েত সংঘের পতনের অন্যতম কারণও বটে:

(ক) সোভিয়েত ব্যবস্থা একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিকে স্বীকার করে। কমিউনিস্ট পার্টিকে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের প্রহরী রূপে গণ্য করা হয়। সোভিয়েত ব্যবস্থায় অন্য রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বেআইনি। এই নীতি ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।

(খ) সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের শত্রুকে কঠোর হস্তে দমন করা হত। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল।

(গ) সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক অধিকার অপেক্ষা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারের উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হত। জনগণের বাক্-স্বাধীনতা সীমিত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে বিবেচনা করা হত এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি দেওয়া হত।

(ঘ) সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পূর্ণ কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।

প্রশ্ন ৮। ভারতের মতো দেশের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির প্রধান পরিণতিসমূহ কি কি ছিল?

উত্তরঃ রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তার বৈদেশিক নীতির একটি প্রধান দিক। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পরও ভারত-রুশ সম্পর্ক উভয় দেশের পক্ষেই সমগুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির ফলে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং দুই শক্তিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অবসান ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে শান্তির বাতাবরণ শুরু হয়। শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে দুই দেশের মধ্যে নানা প্রকার সম্পর্ক ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পরও স্বাধীন রাষ্ট্রমণ্ডলীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নানা কারণে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের রুশ সমর্থন অত্যন্ত প্রয়োজন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির ঠিক পরই ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের প্রতি সমর্থন বন্ধ করে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কেও ভাঁটা পড়ে। ভারতও রাশিয়ার নিকট থেকে ন্যূনতম সামরিক ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি পেত। ১৯৯৩ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন ভারত সফরে আসলে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এই চুক্তি ফলপ্রসূ হয়নি।

২০০০ সালে রুশ প্রধান ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্টের ভারত সফরকালে উভয় দেশই প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে।

২০০৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পুনরায় ভারত সফরে আসেন। তিনি ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন। এই সফরকালে রাশিয়া তামিলনাড়ুর কুড়ানকুলাম পরমাণু কেন্দ্রে অতিরিক্ত চারিটি ইউনিট তৈরি করতে রাজী হন।

তাছাড়াও দুইটি দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি এবং অবৈধ চোরাকারবার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অনেকগুলি চুক্তি সম্পাদন করে।

পরিশেষে বলা যায় যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পর ভারত-রুশ সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও বর্তমানে দুইটি দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন ৯। সোভিয়েত সরকার (শাসন) এবং অর্থ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়াতে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় নূতন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৮ সালে, ১৯২৪ সালে এবং ১৯৩৬ সালে পরপর তিনটি সংবিধান চালু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসন বা সরকার ব্যবস্থা সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা রূপে পরিচিত। 

এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

(ক) সাম্যবাদী নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত: সোভিয়েত শাসন ও অর্থব্যবস্থা সাম্যবাদী নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। লেনিন ও স্ট্যালিন দেশের উপযোগী করে সাম্যবাদী নীতি প্রতিস্থাপন করেন। মার্কসবাদী দর্শন সোভিয়েত সংবিধানের নির্দেশিত নীতি ছিল।

(খ) ‘সোভিয়েত’ ব্যবস্থা: সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংগঠনের ভিত্তি ছিল ‘সোভিয়েত’ ব্যবস্থা। ‘সোভিয়েত’ (Soviet) শব্দের অর্থ হল ‘কাউন্সিল’ বা ‘পরিষদ’। প্রত্যেকটি সোভিয়েত নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা গঠিত ছিল।

(গ) সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা: সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ১৯৩৫ সালের স্ট্যালিন সংবিধানের প্রথম ধারায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি কৃষক ও শ্রমিকদের সমাজতান্ত্রিক গণরাজ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

(ঘ) একদলীয় রাষ্ট্র: সোভিয়েত গণরাজ্যে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি দেশের সর্বোচ্চ নির্দেশক সংস্থা ছিল, তাই অন্য কোন পার্টির অস্তিত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

(ঙ) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ: সোভিয়েত রাষ্ট্র ও দল ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই নীতির অর্থ হল শাসনতান্ত্রিক সকল সংস্থাই গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী নির্বাচিত ও সংঘটিত ছিল। অধস্তন শাসন সংস্থা ঊর্ধ্বতন শাসন সংস্থার অধীন ছিল।

(চ) মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য: সোভিয়েত সংবিধানে নাগরিকদের অনেকগুলি মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য বিধিবদ্ধ ছিল। অধিকারসমূহ মূলত শ্রমিক জনগণের স্বার্থ-সম্বলিত ছিল।

(ছ) যুক্তরাষ্ট্র: সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রীয় ছিল। সোভিয়েত গণরাজ্য নোট ১৫টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার ছিল সর্বশক্তিমান।

(জ) পরিকল্পিত অর্থনীতি: সোভিয়েত অর্থব্যবস্থা পরিকল্পিত অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সমগ্র দেশের জন্য একটি সুসংহত আর্থিক পরিকল্পনা ছিল।

পাঠ্যপুস্তকের প্রশ্নাবলীর উত্তরঃ

প্রশ্ন ১। নিম্নোক্ত কোন্ বিবৃতিটি ভুল সোভিয়েত অর্থনৈতিক প্রকৃতি বর্ণনা করে?

(ক) সমাজবাদে একটি প্রভাবশালী আদর্শ ছিল।

(খ) উৎপাদনে উপাদানসমূহের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রচলিত ছিল।

(গ) জনগণ আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করত।

(ঘ) অর্থনীতির প্রতিটি দিক পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।

উত্তরঃ (গ) জনগণ আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করত।

প্রশ্ন ২। নিম্নলিখিতগুলি ঘটনাক্রম অনুযায়ী সাজাও:

(ক) আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ।

(খ) বার্লিন প্রাচীর পতন।

(গ) সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি।

(ঘ) রুশ বিপ্লব।

উত্তরঃ (ঘ) রুশ বিপ্লব। 

(ক) আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ।

(খ) বার্লিন প্রাচীর পতন।

(গ) সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি।

প্রশ্ন ৩। নিম্নোক্তগুলির মধ্যে কোনটি সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির পরিণতি নয়?

(ক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শগত সংঘাতের অবসান।

(খ) স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উৎপত্তি।

(গ) আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তির সমতায় পরিবর্তন।

(ঘ) মধ্যপ্রাচ্যে সংকট।

উত্তরঃ (ঘ) মধ্যপ্রাচ্যে সংকট।

প্রশ্ন ৪। নিম্নোক্তগুলি সাজিয়ে লেখ:

(a) মিখাইল গোর্বাচভ – (i) সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকার।

(b) শক্ থেরাপি – (ii) সামরিক চুক্তি।

(c) রাশিয়া – (iii) সংস্কার প্রবর্তন।

(d) বরিস ইয়েলৎসিন – (iv) আর্থিক মডেল।

(e) ওয়ারশ – (v) রুশ প্রেসিডেন্ট।

উত্তরঃ (a) মিখাইল গোর্বাচভ – (iii) সংস্কার প্রবর্তন।

(b) শক্ থেরাপি – (iv) আর্থিক মডেল।

(c) রাশিয়া – (i) সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকার।

(d) বরিস ইয়েলৎসিন – (v) রুশ প্রেসিডেন্ট।

(e) ওয়ারশ – (ii) সামরিক চুক্তি।

প্রশ্ন ৫। শূন্যস্থান পূর্ণ কর:

(ক) সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ______ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

উত্তরঃ সমাজতান্ত্রিক।

(খ) ______ সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আরম্ভ করা একটি সামরিক চুক্তি ছিল।

উত্তরঃ ওয়ারশ চুক্তি।

(গ) _____ পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেছিল।

উত্তরঃ কমিউনিস্ট।

(ঘ) _____ ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ।

(ঙ) _____ এর পতন শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি নির্দেশ করে।

উত্তরঃ বার্লিন প্রাচীর।

প্রশ্ন ৬। যে-কোন তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর যা সোভিয়েত অর্থনীতিকে আমেরিকার মতো ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি থেকে পৃথক করে।

উত্তরঃ নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ সোভিয়েত অর্থনীতিকে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি হইতে পৃথক করে:

(ক) সোভিয়েত অর্থনীতি ছিল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ছিল ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি।

(খ) সোভিয়েত অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে সরকারের হাতে ছিল। সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমতি ছিল না। কিন্তু ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রচলিত ছিল।

প্রশ্ন ৭। কি কি পাদান গোর্বাচভকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কার প্রবর্তনে বাধ্য করেছিল?

উত্তরঃ মিখাইল গোর্বাচভ ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি হন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করেন। 

নিম্নোক্ত উপাদানসমূহ তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সংস্কার প্রবর্তনে বাধ্য করেছিল:

(ক) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে নিজের অবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পারমাণবিক ও সামরিক দিক দিয়ে অত্যধিক ব্যয় করতে হয়। কিন্তু সোভিয়েত অর্থনীতি তেমন শক্তিশালী ছিল না।

(খ) সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোগত দিক দিয়ে পশ্চিমী দেশ থেকে অনেক পিছনে পড়েছিল।

(গ) সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত আমলাতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ছিল এবং জনগণ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিল না। বাক্‌স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত থাকায় জনগণ হতাশ হয়ে পড়ে।

(ঘ) কমিউনিস্ট পার্টি সমগ্র শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করত এবং তা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না। দেশে বিরোধী দল ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছিল না।

(ঙ) সোভিয়েত ইউনিয়ন জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারেনি।

(চ) আফগানিস্থানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল করেছিল।

প্রশ্ন ৮। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ভারতবর্ষের মতো দেশের উপর কি কি প্রধান ফলাফল ছিল?

উত্তরঃ রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তার বৈদেশিক নীতির একটি প্রধান দিক। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পরও ভারত-রুশ সম্পর্ক উভয় দেশের পক্ষেই সমগুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির ফলে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং দুই শক্তিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অবসান ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে শান্তির বাতাবরণ শুরু হয়। শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে দুই দেশের মধ্যে নানা প্রকার সম্পর্ক ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পরও স্বাধীন রাষ্ট্রমণ্ডলীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নানা কারণে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের রুশ সমর্থন অত্যন্ত প্রয়োজন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির ঠিক পরই ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের প্রতি সমর্থন বন্ধ করে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কেও ভাঁটা পড়ে। ভারতও রাশিয়ার নিকট থেকে ন্যূনতম সামরিক ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি পেত। ১৯৯৩ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন ভারত সফরে আসলে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এই চুক্তি ফলপ্রসূ হয়নি।

২০০০ সালে রুশ প্রধান ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্টের ভারত সফরকালে উভয় দেশই প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে।

২০০৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পুনরায় ভারত সফরে আসেন। তিনি ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন। এই সফরকালে রাশিয়া তামিলনাড়ুর কুড়ানকুলাম পরমাণু কেন্দ্রে অতিরিক্ত চারিটি ইউনিট তৈরি করতে রাজী হন।

তাছাড়াও দুইটি দেশ বাণিজ্য, বিমান তৈরি এবং অবৈধ চোরাকারবার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অনেকগুলি চুক্তি সম্পাদন করে।

পরিশেষে বলা যায় যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির পর ভারত-রুশ সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও বর্তমানে দুইটি দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

প্রশ্ন ৯। শক্ থেরাপি কি ছিল? এটা কি সাম্যবাদ থেকে ধনতন্ত্রে পরিবর্তন হওয়ার একটি প্রধান উপায় ছিল?

উত্তরঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিতে সাম্যবাদও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। সাম্যবাদের অবসানের পর এই রাষ্ট্রগুলিতে স্বৈরতন্ত্রী সমাজবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে শক্ থেরাপি (shock therapy) বলা হয়। এই রাষ্ট্রসমূহের প্রত্যেকটিতেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বেসরকারি মালিকানা প্রধান বিষয় ছিল। যৌথ খামার ব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি খামার ও মালিকানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

শক্ থেরাপির ফলাফল বা পরিণাম: শক্ থেরাপি ১৯৯০-এর দশকে প্রয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু তা অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে পারে নি। তা রাষ্ট্রসমূহের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিপর্যয় সাধন করে। রাশিয়ায় সরকার-নিয়ন্ত্রিত বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যক্তিদের নিকট বিক্রি করা হয়।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ান মুদ্রা ‘রুবলের’ দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতির হার এত উঁচু হয় যে জনসাধারণ তাদের সঞ্চয় হারান। যৌথ খামারব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ফলে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। রাশিয়া বিদেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি আরম্ভ করে। পুরাতন ব্যবসা পদ্ধতি ভেঙে পড়ে যার কোন বিকল্প থাকে না।

পুরাতন সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। সরকারি ভরতুকি প্রথা বন্ধের ফলে বিশালসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।

স্বৈরতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করার জন্য শক্ থেরাপি প্রধান উপায় ছিল না। তা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারেনি। নব-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রগুলির রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিবর্তনের প্রচেষ্টা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির গতি রুদ্ধ করে দেয়। উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে। ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। কালোবাজারি ও মজুতদারি এই অবস্থায় পূর্ণ সুযোগ লাভ করে। দ্রব্যমূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। স্বাধীন রাষ্ট্রমণ্ডলীর প্রায় সকল দেশই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের শিকার হয়। রাজনৈতিকভাবেও জনগণ লাভবান হয়নি। রাষ্ট্রমণ্ডলীর বিভিন্ন রাষ্ট্র তাড়াহুড়ো করে বিভিন্ন প্রকার সংবিধান তৈরি করে এবং বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবলম্বন করে। কিন্তু এতে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয় নি। সুতরাং এটা বলা যায় যে, শক্ থেরাপি প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের একমাত্র অবলম্বন ছিল না।

প্রশ্ন ১০। “দ্বিতীয় বিশ্বের অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষেরও তার চিরাচরিত বন্ধুত্বপূর্ণ রুশ সম্পর্কের পরিবর্তে আমেরিকার সঙ্গে অধিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়বার জন্য বৈদেশিক নীতির পরিবর্তন করা উচিত।”

উপরোক্ত উক্তিটির স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে একটি প্রবন্ধ রচনা কর।

উত্তরঃ সাধারণভাবে উপরের উক্তিটি সমর্থনযোগ্য নয়। ভারতবর্ষ সর্বদা রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে এবং আমেরিকার সঙ্গে অধিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের কোন প্রয়োজন নেই। 

এর কারণসমূহ নিম্নরূপ:

(ক) ১৯৫০-এর দশক থেকে ভারত ও রুশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতবর্ষকে শিল্পোন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য সহায়তা করত। অন্যদিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত ও উত্তেজনা নিরসনে কখনই আন্তরিক ছিল না, কারণ এটি আমেরিকার রাজনৈতিক ও অস্ত্র ব্যবসায় প্রভূত লাভদায়ক ছিল।

(খ) সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রসঙ্ঘে কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান সমর্থন করত। সোভিয়েত ইউনিয়ন এমনকি বহু সময় ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগ করত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা রাষ্ট্রসঙ্ঘে পাকিস্তানকে সমর্থন করত।

(গ) ভারত ও রাশিয়া বহু মেরুশক্তিবিশিষ্ট বিশ্ব ব্যবস্থা অবলোকন করত। ২০০১ সালে দুই দেশ ৮০টির অধিক নানা বিষয় সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে।

(ঘ) পরমাণু বিস্ফোরণের পর আমেরিকা ভারতকে ক্রায়োজনিক রকেট সরবরাহ করা বন্ধ করলে রাশিয়া তা সরবরাহ করে।

সুতরাং দেখা যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) সর্বদাই ভারতের পাশে ছিল। সুতরাং ভারতের রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন এবং এই মুহূর্তে ভারতের বৈদেশিক নীতি পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top