Class 12 Swadesh Adhyayan Chapter 9 ব্রিটিশ যুগে আসামের শিল্পদ্যোগ Question Answer Bengali Medium As Per The New Syllabus to each chapter is provided in the list so that you can easily browse through different chapters ASSEB Class 12 Swadesh Adhyayan Chapter 9 ব্রিটিশ যুগে আসামের শিল্পদ্যোগ Notes and select need one. AHSEC Class 12 Swadesh Adhyayan Chapter 9 ব্রিটিশ যুগে আসামের শিল্পদ্যোগ Solutions Download PDF. HS 2nd Year Swadesh Adhyayan Solutions Bengali Medium.
Class 12 Swadesh Adhyayan Chapter 9 ব্রিটিশ যুগে আসামের শিল্পদ্যোগ
Also, you can read the NCERT book online in these sections Solutions by Expert Teachers as per Central Board of Secondary Education (CBSE) Book guidelines. ASSEB Class 12 Swadesh Adhyayan Textual Question Answer Bengali Medium are part of All Subject Solutions. Here we have given HS 2nd Year Swadesh Adhyayan Textbook Solutions Bengali Medium for All Chapters, You can practice these here.
(খ) ব্রিটিশ যুগে আসামের শিল্পদ্যোগ
Chapter: 9
| অনুশীলনী |
| দ্বিতীয় ভাগঃ ইতিহাস |
(ক) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাওঃ-
১। কোন গ্রন্থে আসামকে গুটীপোকার দেশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তরঃ মহাকাব্য রামায়ণে আসামকে ‘গুটীপোকার দেশ’ (বা ‘রেশম কীট পালনের দেশ’) বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
২। ‘থুপরী’ শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ অসমীয়া সমাজে বয়ন শিল্প (কাপড় বোনা ও সুতো কাটার কাজ) সম্বন্ধে অজ্ঞ মেয়ে বা মহিলাদের ‘থুপরী’ বলা হত।
৩। আহোম যুগে ‘জোলা’ নামক ‘খেলটি কোন বৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল?
উত্তরঃ আহোম যুগে ‘জোলা’ সম্প্রদায় মূলত তাঁত বোনার (বয়ন শিল্প) মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের কাজে নিযুক্ত ছিল।
৪। আহোম যুগে স্বামীদের যুদ্ধসাজ হিসাবে এক রাত্রির ভিতর স্ত্রীরা যে কাপড় বয়ন করতেন তাকে কি বলা হত?
উত্তরঃ স্বামীদের যুদ্ধযাত্রার পূর্বে এক রাত্রির মধ্যে স্ত্রীদের নিজ হাতে বোনা সেই মন্ত্রপূত কাপড়টিকে ‘কবচ কাপড়’ বলা হত।
৫। ‘সোণ খপা’ অর্থ কি?
উত্তরঃ দীর বালিতে সোনা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে সোণোয়াল পাইকরা সেখানে যে অস্থায়ী শিবির বা ঘর স্থাপন করে বসবাস করতেন, তাকে ‘সোণ খপা’ (বা ‘সোণ কামোরা’) বলা হত।
৬। ‘গুণাকটিয়া’ কাদের বলা হত?
উত্তরঃ আহোম রাজারা স্বর্ণজড়িত (সোনার সুতোর কাজ) কারুকার্যে দক্ষ যে শিল্পীদের বহিরাগত রাজ্য থেকে আসামে এনেছিলেন এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই দক্ষ কারিগরদের গোষ্ঠীকে ‘গুণাকটিয়া’ বলা হত।
৭। ‘লোয়া মাটি’ বলতে কি বুঝায়?
উত্তরঃ বর্ষাকালে নদীর স্রোতে পাহাড় থেকে নেমে আসা লোহা আকর মিশ্রিত যে মাটি সমতলের বিভিন্ন স্থানে জমা হত, তাকেই ‘লোয়া মাটি’ বলা হত। এই মাটি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে লোহা প্রস্তুত করা হত।
৮। ‘খাটাং’ কাকে বলে?
উত্তরঃ প্রাচীন আসামে বাঁশের সাহায্যে প্রস্তুত করা হাতির পা বাঁধার বিশেষ শিকল বা দড়ি জাতীয় বাঁধনকে ‘খাটানি’ বলা হত।
(খ) সংক্ষিপ্ত টীকা লিখ:-
১। আসামের কাসা শিল্প।
উত্তরঃ প্রাচীন আসামে কাসা শিল্পের এক গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল। প্রাক-আহোম যুগে বিভিন্ন ধর্মীয় ও মাঙ্গলিক বাদ্যযন্ত্র যেমন— করতাল, ঘণ্টা, নূপুর ও কিঙ্কিনী তৈরিতে কাসার ব্যাপক ব্যবহার প্রচলিত ছিল। চর্যাপদ, কালিকা পুরাণ, যোগিনীতন্ত্র এবং মাধব কন্দলীর রামায়ণের মতো প্রাচীন গ্রন্থে ও চরিতপুথিগুলোতে কাসা নির্মিত নানাবিধ সামগ্রীর বিবরণ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে আহোম রাজত্বকালে এই কুটির শিল্পটির অভূতপূর্ব প্রসার ঘটে এবং অসমিয়া সমাজ আহার গ্রহণের মূল পাত্র হিসেবে প্রধানত কাসার বাসনই ব্যবহার করতে শুরু করে। কাসার বাসন প্রস্তুতের প্রধান ও প্রসিদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে হাজো, সার্থেবারী এবং যোরহাট জেলার করঙা ও তিতাবর অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কাসা প্রস্তুত করতে অসমিয়া কারিগরেরা মূলত তামা ও টিনের মিশ্রণ ঘটাতেন এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্য মিশ্রণে সামান্য রৌপ্য (রূপা) যোগ করতেন। এই শিল্পের আদি ও দক্ষ কারিগরদের অসমিয়া সমাজে ‘চলুয়া কাসারু’ বলা হত। তাঁরা গলিত কাসাকে প্রথমে মৌমাছির মোমের ছাঁচে ঢেলে বিভিন্ন প্রাথমিক রূপ দিতেন। এরপর অগ্নিকুণ্ডের তাপে সেই ধাতু নরম করে লোহার সাঁড়াশী ও হাতুড়ির সাহায্যে পিটিয়ে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হত এবং সবশেষে ছেনি ও নরুনের নিখুঁত কারুকার্যের মাধ্যমে তা মসৃণ করা হত। প্রাক-ব্রিটিশ আসামে তৈরি কাসার সামগ্রীগুলোর মধ্যে থালা, পায়া লাগানো থালা, কারুকার্য করা বড় পাত্র, বাটি, কলসী ও বটা ইত্যাদি ছিল অন্যতম প্রধান। আহোম রাজারা প্রতিবেশী দেশ ভুটান থেকে কাসার কাঁচা আকর আমদানি করতেন এবং রাজকীয়ভাবে এই ব্যবসা তদারকি করার জন্য ‘উজীর বরুয়া’ নামক একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
২। আসামের তামা শিল্প।
উত্তরঃ প্রাচীন আসামের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ কুটির শিল্প ছিল তামা শিল্প। প্রাচীন কামরূপের রাজাদের জারি করা তাম্রলিপি বা তাম্রফলকসমূহ এই শিল্পের প্রাচীনতা ও অসাধারণ ধাতুশিল্পের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। ঐতিহাসিক সদিয়া অঞ্চলের বিখ্যাত ‘তাম্রেশ্বরী মন্দির’-এর উপরিভাগ সম্পূর্ণ নিখাদ তামা দিয়ে আবৃত ছিল, যা প্রাচীন অসমিয়া তাম্রশিল্পীদের শ্রেষ্ঠ কারিগরির পরিচয় দেয়। দেবালয় বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত তামা নির্মিত কলস, সরাই, প্রদীপ ইত্যাদি তৈরিতে এই কারিগরেরা অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। শুধু তাই নয়, তামা নির্মিত বাসনপত্রের উপরিভাগে সোনা বা রূপার প্রলেপ (পরত) বসিয়ে সেগুলোকে এক রাজকীয় ও চমৎকার নবরূপ দেওয়ার আধুনিক কৌশলও অসমিয়া তাম্রকারদের জানা ছিল।
মধ্যযুগে আসামে নিজস্ব তামার খনি না থাকায় কাঁচা তামা মূলত প্রতিবেশী পার্বত্য অঞ্চলসমূহ এবং চীনদেশ থেকে আমদানি করা হত। কাসারু, কামার এবং বিশেষ করে মোরীয়া সম্প্রদায়ের অত্যন্ত সুদক্ষ কারিগরেরা এই তাম্র শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন। রাজকীয় কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য তামার পাত্র তৈরি ও অলংকরণের কাজেও এই শিল্পীরা যুক্ত ছিলেন।
৩। আসামের পিতল শিল্প।
উত্তরঃ আসামে পিতলের ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত ছিল এবং আহোম রাজত্বকালে এই শিল্পটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। অসমীয়া সমাজে যেকোনো মাঙ্গলিক উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান বা পারিবারিক প্রয়োজনে পিতলের সামগ্রী ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক ছিল। ঘরোয়া নিত্যব্যবহার্য বাসনপত্র ছাড়াও নামঘর ও মন্দিরে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র পিতল দিয়ে প্রস্তুত করা হত। বুরঞ্জী থেকে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আহোম যুগে আসামে পিতল শিল্পের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল মূলত ‘মোরীয়া’ খেল বা সম্প্রদায়ের লোকদের হাত ধরে।
পিতল মূলত তামা ও দস্তার (Zinc) মিশ্রণে প্রস্তুত করা একটি মিশ্র ধাতু। পিতল শিল্পের কারিগরেরা প্রথমে কাঁচা পিতলের বড় পাত বা টুকরো কেটে আগুনের উত্তাপে তপ্ত করতেন এবং লোহার নেহাইয়ের ওপর রেখে হাতুড়ির সাহায্যে পিটিয়ে নির্দিষ্ট আকার দিতেন। তাছাড়া, বিভিন্ন আকারের মাটির পাত্র তৈরি করে তার ভেতর গলিত পিতল ঢেলে (যাকে মাটির ছাঁচ বা মূষা বলা হত) পিতলের নিখুঁত বাসনপত্র ও কলসী তৈরি করা হত। কাসা শিল্পে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী হাতিয়ারগুলোই পিতল তৈরিতেও ব্যবহৃত হত।
৪। আসামের লাক্ষা শিল্প।
উত্তরঃ প্রাক-ব্রিটিশ আসামের কুটির শিল্পগুলোর মধ্যে লাক্ষা বা গালা প্রস্তুতকারী শিল্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক উদ্যোগ ছিল। অসমিয়া কারিগরেরা কেবল প্রতিবেশী পার্বত্য উপজাতিদের কাছ থেকেই কাঁচা লাক্ষা সংগ্রহ করতেন না, বরং আসামের নিজস্ব বনাঞ্চলে লাক্ষা গাছে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘লাক্ষা কীট’ লালন-পালন করে লাক্ষা উৎপাদন করতেন। অসমিয়া সমাজে লাক্ষার ব্যবহার ছিল বহুমুখী। যেকোনো রঙের স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত করতে, বিভিন্ন ধাতু নির্মিত বাসনপত্র বা অলংকার তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাঁচ নির্মাণ করতে লাক্ষার ব্যবহার করা হত। এছাড়া আহোম রাজদরবারের অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র, রাষ্ট্রীয় ঘোষণাপত্র, সন্ধিপত্র এবং চিঠিপত্র সিলগালা করার জন্য লাক্ষা বা গালার সীলমোহর ব্যবহার করা ছিল বাধ্যতামূলক।
আহোম রাজারা এই গুরুত্বপূর্ণ লাক্ষা শিল্পকে রাষ্ট্রীয় নিয়মের অধীনে পরিচালনা করতেন। লাক্ষা সংগ্রহ করা, তা দিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত করা এবং রাজকীয় ভাণ্ডারে তা নিশ্চিতভাবে পৌঁছে দেওয়ার কাজ তদারকি করার জন্য ‘লা-সুঙ্গী’ নামক একটি বিশেষ খেল বা পাইক গোষ্ঠী নিয়োজিত ছিল।
৫। আসামের পারদ প্রস্তুতকারী শিল্প।
উত্তরঃ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় আসামের রাসায়নিক প্রযুক্তিতে অসমিয়াদের অসাধারণ দক্ষতার অন্যতম বড় প্রমাণ ছিল পারদ ও ‘রহ’ প্রস্তুতকারী শিল্প উদ্যোগ। আহোম রাজত্বকালে জল শোধনের (Water Purification) জন্য বেল গাছের আঠাকে একটি বিশেষ রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে ‘রহ’ নামক একটি তরল পদার্থ প্রস্তুত করা হত। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের তদারকি করার জন্য আহোম রাজদরবারে ‘রসৈন্দ্র বরুয়া’ নামক একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
অন্যদিকে, আসামের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী শিল্প স্বর্ণসংগ্রহ বা সোণোয়াল পাইকদের কাজে পারদের রাসায়নিক ব্যবহার ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও অপরিহার্য। নদী থেকে সংগৃহীত সূক্ষ্ম স্বর্ণরেণুর সাথে পারদ ও জল মিশ্রিত করে একটি আঠালো মণ্ড বা পিণ্ড তৈরি করা হত। পরবর্তীতে সেই মণ্ডটিকে শামুকের খোলের ভেতর রেখে নাহার কাঠের আগুনে অত্যন্ত তীব্র উত্তাপে তপ্ত করা হত। এই প্রক্রিয়ায় পারদ বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যেত এবং খাঁটি সোনাটি শামুকের খোলের নিচে জমা থাকত। এটিই ছিল প্রাচীন অসমিয়া ধাতুবিদ্যায় পারদের ব্যবহার এবং এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উন্নত মানের শিল্প উদ্যোগ।
৬। আসামের বয়ন শিল্প সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তরঃ ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রাচীন কাল থেকেই আসামের বয়ন শিল্প (তাঁত বোনা ও সুতো কাটা) এক গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী। মহাকাব্য রামায়ণে আসামকে ‘গুটীপোকার দেশ’ বা ‘রেশম কীট পালনের দেশ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মা কর্তৃক কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধনের কাছে পাঠানো উপহার সামগ্রীর মধ্যে আসামের মূল্যবান রেশম বস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে আহোম রাজাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই কুটির শিল্পটি আসামের ঘরে ঘরে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও স্বাবলম্বী শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
রেশম চাষ ও সুতো উৎপাদন: আসামে সুতো উৎপাদনের জন্য প্রধানত তিন ধরনের রেশম বা গুটীপোকার চাষ করা হত— পাট, মুগা ও এরি।
পাট: পাট সুতোর কাজের সাথে যুক্ত কারিগরদের ‘যুগী’ বা ‘কাটনী’ বলা হত। পাট পোকা মূলত ‘নুনী গাছ’-এর পাতা খেয়ে জীবনধারণ করত।
মুগা: মুগা পোকার প্রধান খাদ্য ছিল সোম গাছ ও সোয়ালু গাছের পাতা। মেজাংকরি গাছের পাতায় প্রতিপালিত পোকা থেকে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও উজ্জ্বল ‘মেজাংকরী সুতো’ তৈরি করা হত, যা ছিল রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক।
এরি: এরি পোকা এরা ও কেচেরু গাছের পাতা খেয়ে বড় হতো। এরি বস্ত্র তুলনামূলক অমসৃণ হলেও অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ছিল।
রেশম পোকা পালনে নারী ও পুরুষ উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পুরুষেরা সাধারণত বনের বাইরে থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পোকা সংগ্রহ ও তদারকি করতেন, আর গৃহের অভ্যন্তরে ডিম থেকে লার্ভা তৈরি, খাদ্য প্রদান এবং কোকন (গুটি) থেকে সুতো কাটার সিংহভাগ কাজ অসমীয়া মহিলারাই সুচারুভাবে সম্পন্ন করতেন।
তাঁতশালে বয়ন কর্ম ও সামাজিক গুরুত্ব: সুতো থেকে বস্ত্র প্রস্তুতের জন্য হস্তচালিত কাঠের তাঁত ব্যবহার করা হত। তাঁতশালের সাথে যুক্ত বিভিন্ন কাঠের ও বাঁশের তৈরি সরঞ্জামগুলো হলো— তাঁতের খুঁটি, টোলোঠা, রাচ, দোপতি, চালিমারি, বান্দরী, নাচনী, গরকা, মাকো, মহুরা, চিরি, শলি, চিপকাতি ইত্যাদি।
অসমীয়া সমাজে প্রতিটি নারী তাঁত বোনার কাজে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। বয়ন শিল্পে অজ্ঞ মেয়েদের অসমীয়া সমাজে উপহাস করে ‘থুপরী’ বলা হত। অন্যদিকে, তাঁত বুনে যারা জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁদের ‘তাঁতী’ ও ‘জোলা’ বলা হত। আহোম রানী ফুলেশ্বরী কুঁয়রী ও সর্বেশ্বরী কুঁয়রী রাজধানী রংপুরে নারীদের জন্য বোবা-কাটার বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। বৈশাখ মাসের বহাগ বিহু উপলক্ষে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নিজ হাতে বোনা গামছা উপহার দেওয়া অসমীয়া সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। স্বামীদের যুদ্ধযাত্রার পূর্বে এক রাতের মধ্যে স্ত্রীরা নিজ হাতে যে বিশেষ মন্ত্রপূত বস্ত্র বুনে দিতেন, তাকে ‘কবচ কাপড়’ বলা হত। আহোম প্রশাসক মোমাই তামুলী বরবরুয়া প্রতিটি অসমীয়া নারীর জন্য দৈনিক সুতো কাটা ও কাপড় বোনা বাধ্যতামূলক করে আসামের বয়ন শিল্পকে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করে তুলেছিলেন।
৭। প্রাচীন আসামের সোণা সংগ্রহ পদ্ধতি সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তরঃ ভূমিকা ও সোণা প্রাপ্তির স্থান: প্রাচীন আসামের অন্যতম প্রধান ও লাভজনক কুটির শিল্প ছিল নদী থেকে সোনা বা স্বর্ণরেণু সংগ্রহ করা। প্রাচীন অসমীয়া সাহিত্য, লোককথা এবং বিদেশী পরিব্রাজকদের বিবরণীতে এর ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায়। মূলত ব্রহ্মপুত্র, সুবর্ণশিরি, দিক্রং, দিহিং, দিবং, দিগারু, ডিব্রু, দিশাং, জাঁজি, বঁরাগ, ভরলী, বুড়ীগাং, জগলু, মানস ইত্যাদি নদীর বালিতে স্বর্ণরেণু পাওয়া যেত। আহোম আমলে নদী থেকে সোনা সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োজিত বিশেষ পাইক গোষ্ঠীকে ‘সোণোয়াল’ বলা হত, যারা প্রতি বছর রাজকোষে প্রায় দুই হাজার থেকে ছয় হাজার তোলা খাঁটি সোনা জমা দিতেন।
সোনা সংগ্রহের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি: সোনা সংগ্রহের মূল প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন:
১। দল গঠন ও প্রাথমিক পরীক্ষা: সোণোয়াল পাইকেরা চারজন করে একটি দল বা ‘গোট’ গঠন করতেন। এই দলের চারজনকে ‘পালি’ এবং তাদের উপদেষ্টা বা দলপতিকে ‘পাতি’ বলা হত। নদীর প্রবল স্রোতের এক তীরের বালি অন্য তীরে ভাসিয়ে নিয়ে গেলে সোণোয়ালরা প্রথমে সেই বালি পরীক্ষা করতেন। সোনা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে তারা নদীর তীরে অস্থায়ী ঘর তৈরি করতেন, যাকে ‘সোণ খপা’ বা ‘সোণ কামোরা’ বলা হত।
২। নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণ ও বালি ছাঁকন: গভীর নদীতে প্রথমে বাঁশ ও ঘাস দিয়ে বিশেষ বাঁধ বা ‘খাঁট’ দেওয়া হত, যাতে জলের স্রোত একটি নির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে বালির হালকা অংশ জলের তোড়ে ভেসে যেত এবং সোনার কণা মিশ্রিত ভারী বালি তলানি হিসেবে জমা হতো। এরপর এই বালি তুলে বাঁশের তৈরি বিশেষ চালনী দিয়ে চেলে নেওয়া হত।
৩। পারদের রাসায়নিক ব্যবহার (Amalgamation): চেলে নেওয়া বালিকে এক বিশেষ গাছের পাতার উপর রেখে জল দিয়ে ধুয়ে স্বর্ণরেণু পৃথক করা হত। এই স্বর্ণরেণুর সাথে পারদ ও জল মিশ্রিত করে একটি আঠালো মণ্ড বা পিণ্ড তৈরি করা হত।
৪। খাঁটি সোনা নিষ্কাশন: পরবর্তীতে এই পারদ ও সোনার মণ্ডটিকে একটি শামুকের খোলের ভেতর স্থাপন করা হত এবং নাহার কাঠের তীব্র আগুনে উত্তপ্ত করা হত। আগুনের তাপে পারদ বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যেত এবং খাঁটি সোনাটি শামুকের খোলের নিচে অবিকৃত অবস্থায় জমা থাকত।
এছাড়া পাহাড়ি নদীর জলের ধারায় উদবিড়ালের চামড়া ডুবিয়ে রাখা হতো, যার ঘন লোমের সাথে স্বর্ণরেণু আটকে যেত। পরবর্তীতে সেই চামড়া ধুয়ে সোনা সংগ্রহ করা হত। চুতীয়া, কাছাড়ী ও কোচ রাজত্বেও এই সোনা সংগ্রহ পদ্ধতি বিপুলভাবে প্রচলিত ছিল।
৮। প্রাচীন আসামের রৌপ্য শিল্পের বিষয়ে আলোচনা কর।
উত্তরঃ উৎস ও রৌপ্য সংগ্রহ পদ্ধতি: প্রাচীন আসামের ধাতুশিল্পের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল রৌপ্য (রুপো) শিল্প। ধনসিঁড়ি, দেক্রং, দেয়াং, দিখৌ প্রভৃতি নদী থেকে রৌপ্যরেণু সংগ্রহ করা হত। রৌপ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত বিশেষ পাইক গোষ্ঠীকে ‘রুপোয়াল’ বা ‘বেড়াল’ বলা হত। রৌপ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও সোনা সংগ্রহের মতোই ছিল। রুপোয়ালরা পাঁচ বা ছয়জনের এক একটি দল গঠন করে নদীর বালি পরীক্ষা করতেন। এই দলের প্রধানকে ‘পাতি’ এবং অন্য সদস্যদের ‘পালি’ বলা হত। বালি খোঁদা, বহন ও ধোয়ার কাজে তাঁরা মূলত ‘দুরাণী’, ‘লেচেতী’ এবং কাঠের তৈরি ‘চরিয়া’ নামক ঐতিহ্যবাহী হাতিয়ার ব্যবহার করতেন।
রৌপ্য আমদানি: আসামের নিজস্ব নদী থেকে উৎপাদিত রৌপ্য ছাড়াও বারহামতি অঞ্চল ও সিঙ্গফোদের মাধ্যমে এবং পার্শ্ববর্তী পার্বত্য উপজাতিদের (যেমন— মিশমি, নিচি ইত্যাদি) কাছ থেকে চীনদেশে উৎপাদিত রূপা আসামে আমদানি করা হত।
রৌপ্য সামগ্রী ও কারুশিল্প: রৌপ্য দিয়ে অসমীয়া কারিগরেরা অত্যন্ত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন বাসনপত্র, দেবদেবীর মূর্তি এবং রাজকীয় অলংকার প্রস্তুত করতেন। আহোম রাজারা তাঁদের রাজকীয় টাকশালে রৌপ্যের মুদ্রা বা মোহর প্রস্তুত করতেন (যেমন— কোচ রাজ্যের রৌপ্য নির্মিত ‘নারায়ণী মোহর’)। এছাড়া রৌপ্য খচিত ডাবজরা, শরাই, সফুড়া, গামখারু ইত্যাদি রাজকীয় ব্যবহারের জন্য তৈরি হত। তামা বা পিতলের বাসনের ওপর রূপার কারুকার্য করার চমৎকার চল ছিল। এই শিল্পের কারখানাগুলো স্বর্ণশিল্পীদের কারখানার অনুকরণেই তৈরি করা হতো এবং রূপার পাত তৈরি বা কারুকার্যের জন্য ‘বাগী’ ও ‘কুন্দশাল’ নামক বিশেষ হাতিয়ারের প্রয়োজন হত।
৯। প্রাচীন আসামের লৌহ শিল্প সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তরঃ ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও কাঁচামাল সংগ্রহ: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় আসামের আর্থ-সামাজিক ও সামরিক ক্ষেত্রে লৌহ শিল্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মেরুদণ্ডস্বরূপ শিল্প ছিল। মধ্যযুগীয় আসামে ‘তিরোয়াল’ ও ‘লো-শলীয়া’ নামক খেল বা পাইক গোষ্ঠী এই লৌহ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। আহোম যুগে শিবসাগরের রূণপুর, নাগাপাহাড়ের পাদদেশ এবং জয়পুর থেকে তিরুপাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে অসংখ্য লৌহশাল গড়ে উঠেছিল।
লোহা নিষ্কাশন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ:
১। লোয়া মাটি সংগ্রহ: বর্ষাকালে পাহাড়ের উপর থেকে পাহাড়ি নদীর তীব্র স্রোতে লোহা আকর মিশ্রিত যে মাটি সমতলের বিভিন্ন স্থানে জমা হত, তাকেই ‘লোয়া মাটি’ বলা হত।
২। পরিশোধন ও গলানো: শীতকালে লো-শলীয়ারা এই মাটি খনন করে এক গভীর গহ্বরে (‘গহুর’) জমা করতেন। গহ্বরটি জলপূর্ণ করে মাটির সাথে লোহা আকর মিশ্রিত করে লোহার উপাদানটি কাদা থেকে পৃথক করা হত। এরপর সেই পরিশ্রুত লোহা-মিশ্রিত উপাদানকে একাধিক ধাপে বৃহৎ চুল্লিতে আগুনের তীব্র তাপে গলানো হতো। উত্তাপে লোহা গলে তরল আকার ধারণ করলে তা থেকে সমস্ত বর্জ্য পদার্থ অপসারিত করে লোহার নরম মণ্ড প্রস্তুত করা হত।
৩। ইস্পাত (তীখা) তৈরি: এই সাধারণ লোহাকে অত্যন্ত শক্ত ও উন্নত মানের ইস্পাত বা ‘তীখা’-য় রূপান্তর করার এক চমৎকার দেশীয় প্রযুক্তি অসমিয়াদের জানা ছিল। নাহার বা করতে গাছের শক্ত কাঠ জ্বালিয়ে লোহাকে লাল করে উত্তপ্ত করার পর অভিজ্ঞ ওঝারা (বিশেষজ্ঞ কামার) সেই তপ্ত লোহা পুনরায় ঠাণ্ডা জলে ডুবিয়ে ইস্পাতে পরিণত করতেন।
লৌহ সামগ্রী ও কারুকার্য: অসমিয়া কামারেরা লোহা দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র (দা, তলোয়ার, বল্লম, তীর-ধনুক, কামান) এবং নিত্যব্যবহার্য গৃহস্থালি ও কৃষিকাজের সরঞ্জাম (ছেনি, হাতুড়ি, সাড়াশী, কোদাল) তৈরি করতেন। এছাড়া লোহার অস্ত্রের ওপর সোনা, রূপা বা পিতলের পাত বসিয়ে চমৎকার নকশা করার পদ্ধতিকে ‘মলমা করা’ বা ‘মীনা কাজ’ বলা হত। এই লোহার সামগ্রীগুলোতে সিংহ, ময়ূর ইত্যাদির সুন্দর চিত্র খোদাই করা থাকত।
১০। প্রাচীন আসামের মৃৎশিল্পর বিষয়ে কি জান লিখ।
উত্তরঃ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শিল্পী সম্প্রদায়: প্রাচীন আসামে মৃৎশিল্প (মাটির পাত্র ও সামগ্রী তৈরি) অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। গুয়াহাটি, নগাঁও, তেজপুর, গোলাঘাট ইত্যাদি অঞ্চলে খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত মাটির প্রাচীন বাসনপত্র এর অন্যতম প্রমাণ। মধ্যযুগে আহোম, কোচ, কাছাড়ী ও চুতীয়া রাজাদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৃৎশিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। এই শিল্পের সাথে যুক্ত কারিগরদের অসমিয়া সমাজে ‘কুমার’, ‘হীরা’ এবং ‘খনিকর’ বলা হত।
মাটি ও তৈরির পদ্ধতি (হীরা বনাম কুমার): মৃৎশিল্পের প্রধান কাঁচামাল ছিল নদীগর্ভ থেকে সংগৃহীত বিশেষ আঠালো পলিমাটি, যাকে ‘কুমোর মাটি’ বা ‘হীরার মাটি’ বলা হত।
মাটির পাত্র তৈরির ক্ষেত্রে কুমার ও হীরা সম্প্রদায়ের মধ্যে এক চমৎকার বৈসাদৃশ্য দেখা যায়:
কুমার সম্প্রদায়: কুমারেরা মাটির পাত্র গড়তে মূলত ঘূর্ণায়মান কাঠের চাকা বা ‘চাক’ ব্যবহার করতেন।
হীরা সম্প্রদায়: হীরা সম্প্রদায়ের মহিলারা কোনো ধরণের চাকা বা চাক ব্যবহার করতেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ হাত এবং বাঁশ বা কাঠের বিশেষ গোলাকৃতি হাতুড়ি জাতীয় হাতিয়ারের সাহায্যে মাটির পাত্রকে নিখুঁত গোল আকার দিতেন।
পাত্র গড়ার পর সেগুলোকে রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হতো। তাঁরা নিত্যব্যবহার্য বাসনপত্র, কলস, কাপ ছাড়াও মাটির উনুন, রান্নার জন্য ‘আপারী’ এবং পাত্রের গায়ে নকশা করার জন্য ‘আঠালী’ নামক হাতিয়ার তৈরি করতেন।
টেরাকোটা ও ইট শিল্প: মাটির পাত্র ছাড়াও পোড়ামাটির ফলক ও দেবদেবীর মূর্তি (Terracotta) নির্মাণে অসমিয়া শিল্পীরা অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
এর পাশাপাশি প্রাচীন আসামের মৃৎশিল্পের অধীনে ইট প্রস্তুতকারী শিল্পটি ছিল অত্যন্ত উন্নত ও আকর্ষণীয়। ‘ইটাসজীয়া’ নামক পাইক গোষ্ঠী বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাটি চেলে কাঠের ছাঁচে ফেলে বিভিন্ন আকৃতির ইট (যেমন— তিলকুনীয়া, টুপীধারী, গোল) তৈরি করতো। বুরঞ্জীর বিবরণ অনুযায়ী, এই ইটগুলোকে পাথর তুল্য শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য মাটির সাথে বিশেষ জৈব তরল মিশ্রিত করা হত; যার মধ্যে গরুর মূত্র, গুড়, মাষকলাই, চুন, সরিষার তেল, এবং মহিষের রক্তে পুষ্ট হওয়া জোঁকের বিশেষ রস বা লাল রঙ উল্লেখযোগ্য ছিল। রাজপ্রাসাদ, সাকো ও মন্দির তৈরিতে এই ইটগুলোকে জোড়া দেওয়ার জন্য বিশেষ আঠালো চুন-বালি বা ‘করাল’ ব্যবহৃত হতো, যা তদারকি করতেন ‘করাল বরুয়া’।
১১। ‘Geographical Sketches of Assam’ গ্রন্থটির লেখক কে?
উত্তরঃ এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটির লেখক হলেন ডাঃ জন পিটার ওয়েড (Dr. John Peter Wade)। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন ওয়েলশের আসাম অভিযানের সময় তিনি একজন সহকারী সার্জন হিসেবে আসামে এসেছিলেন এবং ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে আসামের ভূগোল ও ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে এই বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন।
১২। আসামে কখন ব্রিটিশ শাসন আরম্ভ হয়?
উত্তরঃ ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে (২৪ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ইয়ান্ডাবু সন্ধির মাধ্যমে) আসামে ব্রিটিশ শাসন আরম্ভ হয়।
১৩। আসামে গঠিত প্রথম চা কোম্পানীর নাম কি ছিল?
উত্তরঃ আসামে গঠিত প্রথম চা কোম্পানিটির নাম ছিল ‘আসাম টি কোম্পানি’ (Assam Tea Company), যা ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৪। কোন গভর্ণর জেনারেলের আমলে ‘টি কমিটি’ গঠিত হয়?
উত্তরঃ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (Lord William Bentinck)-এর আমলে ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে চা শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘টি কমিটি’ (Tea Committee) গঠন করা হয়েছিল।
১৫। আসামে প্রথম কখন খনিজ তেলের প্রণালীবদ্ধ উত্তোলন আরম্ভ হয়?
উত্তরঃ আসামে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে মাকুমে প্রথম খনিজ তেলের প্রণালীবদ্ধ খনন প্রক্রিয়া তথা উত্তোলন কার্যক্রম আরম্ভ হয়।
১৬। আসামে উৎপাদিত চা-গাছের বৈজ্ঞানিক নাম কি?
উত্তরঃ আসামে উৎপাদিত চা-গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Camellia sinensis var. assamic.
১৭। আসামে স্থাপিত প্রথম পেট্রোলিয়াম উত্তোলনকারী কোম্পানীর নাম কি?
উত্তরঃ আসামে স্থাপিত প্রথম পেট্রোলিয়াম উত্তোলনকারী কোম্পানিটির নাম হলো ‘আসাম অয়েল কোম্পানী’ (Assam Oil Company)। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ৩১০,০০০ পাউণ্ড স্টার্লিং পুজি বিনিয়োগ করে এই কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৮। ১৮৫৩ খ্রিঃ লর্ড ডালহৌসী কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন?
উত্তরঃ ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ভারতে রেল যোগাযোগ প্রবর্তন ও পরিচালনার বিষয়ে এক ঐতিহাসিক লিখিত কার্যবিবরণীর (Minute) মাধ্যমে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি রেল যোগাযোগের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিক উপযোগিতার কথা প্রকাশ করেন এবং এটি পরিচালনার জন্য আটটি ব্যক্তিগত কোম্পানির ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেন।
১৯। আসামে প্রথম রেলপথ কবে স্থাপিত হয়?
উত্তরঃ আসামে প্রথম রেলপথ ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত হয়। ‘আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী’ ডিব্রুগড়ের আমোলাপট্টি থেকে দিনজান পর্যন্ত চা-পাতা সরবরাহের উদ্দেশ্যে এই ১৫ মাইল দীর্ঘ রেলপথটি স্থাপন করেছিল।
২০। অরুণোদয় কোন জায়গা থেকে প্রকাশিত হয়?
উত্তরঃ ‘অরুণোদয়’ (অসমীয়া ভাষার প্রথম মাসিক পত্রিকা) আসামের শিবসাগর থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা প্রথম এটি প্রকাশ করেছিলেন।
(গ) সংক্ষিপ্ত টীকা লিখ:-
১। আসামের চা শিল্প।
উত্তরঃ আসামের চা শিল্প কেবল ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। শুরুতে পৃথিবীতে চা গাছের উৎপত্তিস্থল নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও এবং পানীয় হিসেবে চীনদেশের একচেটিয়া অধিকার থাকলেও, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আসামে বুনো চা গাছের আবিষ্কার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ভারতে চা চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য ‘টি কমিটি’ (Tea Committee) গঠন করেন। আসামের জঙ্গল থেকে মেজর রবার্ট ব্রুস এবং পরবর্তীতে লর্ড চার্লটন সদিয়া অঞ্চলে বুনো চা গাছ প্রত্যক্ষ করে টি কমিটিকে অবহিত করেন। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিনিধি দল সদিয়ায় অনুসন্ধান চালিয়ে এটি চা গাছ বলে নিশ্চিত করেন এবং ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আসামে উৎপাদিত চা-পাতার প্রথম চালান (১২টি বাক্স) লন্ডনে পাঠানো হয়। লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা এই চায়ের গুণাগুণ চীনদেশের চায়ের সমতুল্য বলে ঘোষণা করলে আসামে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের জোয়ার আসে।
এই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ভারতের যৌথ পুঁজিপতিদের উদ্যোগে ‘আসাম টি কোম্পানী’ (Assam Tea Company) গঠিত হয়, যা ছিল আসামের প্রথম চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বিখ্যাত অসমীয়া ব্যক্তিত্ব মণিরাঙ দেওয়ান এই কোম্পানিতে দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে দুটি চা বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে ‘মাইজান টি কোম্পানী’ এবং ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘যোরহাট টি কোম্পানী’র মতো বেশ কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৮৫৮-৫৯ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ আসামে মোট চা বাগানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭টি, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। চা চাষের সম্প্রসারণের ফলে আসামের অর্থনীতি ও জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, কারণ চা বাগানের কাজের জন্য ছোটনাগপুর, ওড়িশা, বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে দলে দলে শ্রমিক আমদানি করা হয়, যা আজ আসামের এক বিশাল ‘চা-জনগোষ্ঠী’র সৃষ্টি করেছে। আসামে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এই চা-গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Camellia sinensis var. assamica।
২। আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী।
উত্তরঃ আসামের শিল্পায়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ‘আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী’র (ARTC) অবদান অবিস্মরণীয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশেষত উজানী আসামে উৎপাদিত চা এবং খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ও খনিজ তেল অত্যন্ত দ্রুত ও কম খরচে নদী বন্দরগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই কোম্পানির জন্ম হয়েছিল। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে এই কোম্পানি আসামের বুকে প্রথম রেলপথ স্থাপন করে এক নতুন যুগের সূচনা করে। প্রাথমিকভাবে ডিব্রুগড়ের আমোলাপট্টি থেকে দিনজান পর্যন্ত চা-পাতা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ১৫ মাইল দীর্ঘ এই রেলপথটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই লাইনটি মারঘেরিটার কয়লা খনি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়, যা পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘ডিব্রু-সদিয়া রেলপথ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি খনিজ সম্পদ উত্তোলনেও কোম্পানিটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানিটি মারঘেরিটা এবং জয়পুর অঞ্চলে প্রায় ৩০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে কয়লা উত্তোলনের জন্য ২০ বছরের লিজ লাভ করে এবং লেডো, নামদাং, বরগোলাই ইত্যাদি খনিতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদন শুরু করে। শুধু তাই নয়, লখিমপুর জেলায় তেল অনুসন্ধানের জন্য ২৫ বছরের লিজ পেয়ে কোম্পানিটি ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ডিগবই অঞ্চলে তেলের কূয়া খনন করতে শুরু করে এবং মারঘেরিটাতে একটি ছোট তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানিটি তার খনিজ তেল সংক্রান্ত সমস্ত অধিকার নবগঠিত ‘আসাম অয়েল কোম্পানী’র হাতে হস্তান্তর করলেও, আসামে রেল যোগাযোগ ও খনিজ শিল্পের মজবুত ভিত্তি স্থাপনে তাদের অবদান ছিল ঐতিহাসিক।
৩। আসামের পেট্রোলিয়াম শিল্প।
উত্তরঃ আসামের অর্থনীতিতে খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিকারিক ক্যাপ্টেন উইলকক্স প্রথম শিবসাগর জেলার পশ্চিমাঞ্চলে খনিজ তেল ও কয়লা ক্ষেত্রের সন্ধান পান। এরপর ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিশনার জেনকিন্স বরহাটের নিকট এবং ক্যাপ্টেন হ্যানয় সদিয়া অঞ্চলে তেলের উৎসের কথা উল্লেখ করেন। স্থানীয় সিঙ্গফো উপজাতিরা বহু আগে থেকেই মাটির নিচে তেলের বুদবুদ এবং তীব্র আওয়াজ পাওয়ার কথা জানত। প্রথম দিকে বিচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষার পর, ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে মাকুমে আধুনিক ও প্রণালীবদ্ধ পদ্ধতিতে প্রথম খনিজ তেলের কূয়া খনন করা হয়। কিন্তু ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে প্রথম দিকে এই উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেনি।
আসামে পেট্রোলিয়াম শিল্পের আসল সাফল্য আসে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ডিগবই অঞ্চলে তেল পাওয়ার মাধ্যমে। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে লিজ পাওয়া ‘আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী’ ডিগবইয়ের তেলের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ৩১০,০০০ পাউন্ড স্টার্লিং পুঁজি নিয়ে ‘আসাম অয়েল কোম্পানী’ (Assam Oil Company) প্রতিষ্ঠা করে। ডিগবইতেই স্থাপিত হয় এশিয়ার প্রথম আধুনিক তেল শোধনাগার (Refinery)। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে এই কোম্পানির দায়িত্ব ‘বার্মা অয়েল কোম্পানী’র (BOC) হাতে চলে যায়। স্বাধীনতার পর ভারতের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কমিশন (ONGC), ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOCL) এবং অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড (OIL)-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ডিগবইয়ের পাশাপাশি নুনমাটি, বঙ্গাইগাঁও এবং নুমলী গড়ে আরও তিনটি তেল শোধনাগার গড়ে উঠেছে, যা আসামের পেট্রোলিয়াম শিল্পকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৪। এইচ, বি, মেভলিকট।
উত্তরঃ এইচ, বি, মেভলিকট (H. B. Medlicott) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (Geological Survey of India) একজন অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদর্শী ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট। আসামের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কয়লা সম্পদের পরিমাণ, গুণগত মান এবং এর বাণিজ্যিক উপযোগিতা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিরূপণ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আসামের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত ডিহিং নদীর অববাহিকায় কয়লার সন্ধান পাওয়ার পর, সরকারের নির্দেশে মেভলিকট সমগ্র উজানী আসামের কয়লা ক্ষেত্রগুলোতে এক বিস্তারিত জরিপ কার্য পরিচালনা করেন।
তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে আসামের কয়লা ক্ষেত্রগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন— শিবসাগর জেলার জয়পুর অঞ্চল এবং মাকুমের নিকটবর্তী তিরাপে অবস্থিত কয়লা ক্ষেত্র। তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে, মারঘেরিটা ও তিরাপে পাওয়া কয়লা অত্যন্ত উন্নত মানের, যা সরাসরি ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা কয়লার সমকক্ষ। মেভলিকট তাঁর পেশ করা প্রতিবেদনে পরামর্শ দেন যে, সরকারি উদ্যোগে কয়লা খনি পরিচালনা করার চেয়ে বেসরকারি ব্যক্তিগত পুঁজি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন করা বেশি লাভজনক হবে। তাঁর এই সুচিন্তিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের কলকাতা গেজেটে আসামের কয়লা লিজ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, যার ফলস্বরূপ ‘আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী’ কয়লা উত্তোলনে বিশাল সাফল্য অর্জন করে।
৫। আসামে পেট্রোলিয়াম শিল্পের সূচনা সম্বন্ধে একটি টীকা লিখ।
উত্তরঃ আসামে পেট্রোলিয়াম শিল্পের সূচনার ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ইয়ান্ডাবু সন্ধির পর ব্রিটিশ আধিকারিকেরা যখন আসামের ভূখণ্ডে প্রাকৃতিক সম্পদের সমীক্ষা শুরু করেন, তখন ক্যাপ্টেন উইলকক্স নামক এক সেনানায়ক প্রথম শিবসাগরের কয়লা ও তেল ক্ষেত্রের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। এরপর ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিশনার জেনকিন্স নামক এক ইংরেজ কর্মকর্তা সরকারি নথিতে বরহাটের কাছে কয়েকটি তেলের উৎসের সন্ধান পাওয়ার কথা নথিভুক্ত করেন। স্থানীয় সিঙ্গফো জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তেল উপচে পড়া এবং মাটির তলা থেকে দূরবর্তী বজ্রপাতের মতো শব্দের সাথে তেল নিসরণের বিষয় ক্যাপ্টেন হ্যানয়কে অবহিত করেছিলেন।
বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলনের জন্য ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে লখিমপুর জেলায় ওভায়েনট্রেইবার নামক এক ব্যবসায়ী প্রথম লিজের আবেদন করলেও ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের পূর্বে কোনো পদ্ধতিগত খননকাজ শুরু হয়নি। মিস্টার গুডএনাফ নামক একজন উদ্যোক্তা মাকুমে প্রথম আধুনিক রিগ বসিয়ে তেল তুলতে শুরু করেন, তবে সে সময় যাতায়াত ও পরিবহণের চরম অব্যবস্থার কারণে উত্তোলিত তেল বাজারে পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ‘আসাম রেলওয়ে এণ্ড ট্রেডিং কোম্পানী’ রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি লখিমপুর জেলায় তেল তোলার অধিকার লাভ করে। তারা ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ডিগবইয়ে গভীর কূয়া খনন শুরু করে এবং ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে সেখানে প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের তেল পাওয়া যায়। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই মারঘেরিটাতে একটি ছোট রিফাইনারি স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘আসাম অয়েল কোম্পানী’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আসামে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী পেট্রোলিয়াম শিল্পের সূচনা ঘটে।
৬। অসমীয়া ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপ্টিষ্ট মিশনারীদের অবদান সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলোচনা কর।
উত্তরঃ ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে আসামে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ১৮৩৬-৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এক চরম ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে আসামের স্কুল ও আদালতের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়ে। ঠিক এই ক্রান্তিলগ্নে খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে আসামে আসা আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা অসমীয়া ভাষা ও সাহিত্যের পুনরুজ্জীবনে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেন। ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে রেভারেণ্ড নাথান ব্রাউন এবং অলিভার টি কাটার সদিয়াতে এসে পৌঁছান এবং পরবর্তীতে মাইলস ব্রনসন তাঁদের সাথে যোগ দেন।
অসমীয়া ভাষাকে পুনরায় তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে মিশনারিরা নিম্নলিখিত যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছিলেন:
১। প্রথম অসমীয়া পত্রিকা ‘অরুণোদয়’ (১৮৪৬): ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শিবসাগর থেকে আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা অসমীয়া ভাষার প্রথম মাসিক পত্রিকা ‘অরুণোদয়’ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাটি অসমীয়া গদ্যের আধুনিক রূপ দান করে এবং ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভূগোল ও সাহিত্যের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে সাধারণ মানুষের কাছে অসমীয়া ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলে।
২। ব্যাকরণ ও অভিধান প্রণয়ন: ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নাথান ব্রাউন প্রথম অসমীয়া ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘Grammatical Notices of the Asamese Language’ রচনা করেন। এরপর ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মাইলস ব্রনসন প্রথম অসমীয়া-ইংরেজি অভিধান ‘A Dictionary in Assamese and English’ সংকলন ও প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেছিল যে অসমীয়া কোনো উপভাষা নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও প্রাচীন ভাষা।
৩। বিদ্যালয় স্থাপন ও পাঠ্যপুস্তক রচনা: মিশনারিরা জয়পুর ও নামচাং-এ আধুনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং অসমীয়া ভাষায় বিজ্ঞান, ইতিহাস ও গণিতের বহু পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেন। বাইবেলকে অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করে তাঁরা এই ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন।
আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন এবং অন্যান্য অসমীয়া বুদ্ধিজীবীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিশনারিদের এই লাগাতার লড়াইয়ের ফলেই অবশেষে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বিদ্যালয় ও আদালতে অসমীয়া ভাষাকে পুনরায় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
৭। ব্রিটিশ শাসন আসামে কি ধরণের পরিবর্তন আনয়ন করে সে সম্বন্ধে আলোচনা কর।
উত্তরঃ ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহাসিক ইয়ান্ডাবু সন্ধির মাধ্যমে আসামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হয়। দীর্ঘ ছয়শত বছরের আহোম রাজত্বের পতন ঘটিয়ে ইংরেজরা আসামকে তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে।
ব্রিটিশদের এই আগমন আসামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল, যা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন: ব্রিটিশরা আসামের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী শাসন কাঠামো ও কর আদায় পদ্ধতি (যেমন— মোমাই তামুলী বরবরুয়া প্রবর্তিত ‘পাইক প্রথা’) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে। তার পরিবর্তে তারা আধুনিক ইউরোপীয় আমলাতান্ত্রিক শাসন, লিখিত আইন এবং মুদ্রা ভিত্তিক খাজনা আদায়ের পদ্ধতি প্রবর্তন করে। যুগ যুগ ধরে চলা অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অরাজকতা দূর করে তারা আসামে এক স্থিতিশীল কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
অর্থনৈতিক রূপান্তর ও আধুনিক শিল্পায়ন: ব্রিটিশদের হাত ধরেই আসামের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এক বিশাল পুঁজিপতি ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আসামে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এবং লর্ড ডালহৌসির মতো গভর্নর জেনারেলদের পৃষ্ঠপোষকতায় চা, খনিজ তেল ও কয়লা শিল্পের মতো আধুনিক কল-কারখানা গড়ে ওঠে। ব্রহ্মপুত্রে নিয়মিত বাষ্পীয় জাহাজ চলাচল শুরু হয় এবং খনিজ সম্পদ পরিবহনের সুবিধার্থে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে আসামে প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। ডাক ও তার (Telegraph) যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
জনবিন্যাস ও সামাজিক পরিবর্তন: আধুনিক চা বাগান এবং কয়লা ও তেলের খনিগুলোতে কাজ করার জন্য প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। স্থানীয় অসমিয়ারা কৃষিকাজে আত্মনির্ভরশীল হওয়ায় ব্রিটিশরা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ (যেমন— বিহার, ওড়িশা, ছোটনাগপুর, উত্তরপ্রদেশ) থেকে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আসামে নিয়ে আসে, যা আসামের জনবিন্যাসে এক নতুন ও বৈচিত্র্যময় শ্রমজীবী সমাজের (চা-জনগোষ্ঠী) জন্ম দেয়। এছাড়া প্রশাসনের কাজ ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারের জন্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে শিক্ষিত বাঙালি কর্মচারীদের নিয়ে আসা হয়, যার ফলে আসামে জনসংখ্যার ঘনত্ব ব্যাপক বৃদ্ধি পায় (১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ লক্ষ জনসংখ্যা ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ১৫ লক্ষে পৌঁছায়)।
ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রভাব: ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি ও অসমীয়া সমাজ সংস্কারকদের (যেমন— আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন) যৌথ প্রচেষ্টায় ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে অসমীয়া ভাষা পুনরায় তার সরকারি মর্যাদা ফিরে পায়। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ‘কটন কলেজ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আসামে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটে, যা এক নতুন মধ্যবিত্ত ও যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির জন্ম দেয়। এই শ্রেণির হাত ধরেই পরবর্তীতে আসামের আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল।

